কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা নিহত হয়েছেন। একই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
আজ বুধবার বিকেল চারটার দিকে ক্যাম্পাসের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের সমাজকল্যাণ বিভাগে ওই শিক্ষকের ২২৬ নম্বর কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।
শিক্ষকের মৃত্যুর বিষয়টি মুক্তকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ঈমাম। তিনি বলেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনার সময় ওই শিক্ষক বেঁচে ছিলেন। তবে ওয়ার্ডে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করামাত্রই তিনি মারা যান। তাঁর মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করা হয়েছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আরেকজন পুরুষকে আনা হয়েছে। তাঁর অবস্থা গুরুতর। তাঁকে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেওয়া হয়েছে।
.আসমা সাদিয়ার স্বামী ইমতিয়াজ পারভেজ কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইংরেজি বিষয়ের ইনস্ট্রাক্টর। কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়া এলাকায় তাঁদের বাসা। ইমতিয়াজের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া সদরের বংশীতলা গ্রামে। আসমা সাদিয়ার বাবার বাড়ি দৌলতপুর উপজেলায়। তাঁদের সংসারে তাইবা, তাবাসসুম, সাজিদ ও আয়েশা নামে চার ছেলেমেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ের বয়স ৯ বছর। ছোট মেয়ের বয়স মাত্র ১ বছর।
শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সমাজকল্যাণ বিভাগের ইফতার মাহফিল ছিল। এ জন্য বেলা তিনটায় অফিস শেষ হলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভাগে অবস্থান করছিলেন। বিকেল চারটার দিকে ক্যাম্পাসের আনসার সদস্যরা বিভাগের চেয়ারম্যানের কক্ষে চেঁচামেচির আওয়াজ শুনতে পান। পরে আনসার সদস্যরা বাইরে থেকে দরজা ধাক্কাধাক্কি করেন। এমন সময় ইফতার আয়োজনের দায়িত্বে থাকা বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী ধাক্কাধাক্কির কারণ জানতে ওই শিক্ষকের কক্ষের সামনে উপস্থিত হন। পরে দরজা ভেঙে ওই শিক্ষকের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এ সময় কর্মচারী ফজলুর রহমান নিজের গলায় ছুরিকাঘাত করছিলেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাঁদের উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠান।
.ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নারী শিক্ষককে হত্যা.বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ফজলুর রহমান ৮-৯ বছর ধরে চুক্তিভিত্তিক (দিন হাজিরা) সমাজকল্যাণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মজুরি বাড়ানো নিয়ে মাসখানেক আগে তাঁর সঙ্গে শিক্ষক আসমা সাদিয়ার বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে তাঁকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। সমাজকল্যাণ বিভাগটি দ্বিতীয় তলায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ তৃতীয় তলায়। অনেকের ধারণা, এ ঘটনার ক্ষোভের জেরে আজকের ঘটনা ঘটতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শাহীনুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। এ সময় একজনের নিথর দেহ ও একজনকে নড়াচড়া অবস্থায় উদ্ধার করি। পরে দ্রুত কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠায়। পরে জানতে পারি, কর্তব্যরত চিকিৎসক শিক্ষককে মৃত ঘোষণা করেছেন।’
.সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে শিক্ষকের মরদেহ ট্রলিতে রাখা আছে। আশপাশে স্বজনেরা কান্না করছেন।
স্ত্রী নিহতের খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়েন স্বামী ইমতিয়াজ। তাঁকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসা দিয়ে একই হাসপাতালে কিছুক্ষণ রাখা হয়। এক ঘণ্টা পর তাঁকে বাড়িতে নেওয়া হয়। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন স্বজনেরা। তিনি কান্না করতে করতে মূর্ছা যাচ্ছিলেন। গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে পারছিলেন না।
এদিকে মায়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে দুই মেয়ে তাইবা ও তাবাসসুম কান্না করছিল। তাবাসসুম তাদের স্বজনদের জড়িয়ে বারবার বলছিল, ‘আম্মু কই, আম্মু কই। আমি আমার আম্মুর কাছে যাব। আম্মুর মুখ দেখব। আমার আম্মুর কাছে নিয়ে যাও।’
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, বিভাগের ইফতার মাহফিল ছিল। আয়োজনের মধ্যে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে সর্বশেষ বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়ার সঙ্গে কথা বলে ক্যাম্পাসের ডরমিটরিতে চলে আসেন তিনি। বিকেল চারটার কিছু সময় পর এক ছাত্র ফোন করে জানায়, ম্যাডামকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। গিয়ে দেখেন, দুজনের নিথর দেহ বের করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থল থেকে রাত সাতটার দিকে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস্) ফয়সাল মাহমুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হত্যায় ব্যবহৃত দুটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া একাধিক আলামত জব্দ করা হয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ক্রাইম সিন ইউনিটসহ বেশ কয়েকটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না কী কারণে এই ঘটনা ঘটেছে বা এই ঘটনায় এক বা একাধিক ব্যক্তি জড়িত কি না।






