একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর এ ধরনের হামলা কোনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। ধ্বংসযজ্ঞ কখনো মানবতার মধ্যে পড়ে না। এটা আসলে খুবই দুঃখজনক। ভবিষ্যতে যাতে এমন কর্মকাণ্ড আর না ঘটে। সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের দেওয়া আগুনে দগ্ধ মুক্তকণ্ঠ ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি শিল্পকর্ম ‘আলো’র প্রদর্শনীর ১০ম দিন ছিল আজ শুক্রবার। ছুটির দিনে নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ ও শিক্ষার্থীরা আসেন এই প্রদর্শনী দেখতে। ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা দেখে তাঁরা এ কথা বলেন।
এদিন প্রদর্শনী দেখতে আসেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। দীর্ঘদিন বাংলাদেশ বিষয়ে লেখালেখি করছেন তিনি। আজ প্রদর্শনী ঘুরে দেখে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বার্গম্যান লেখেন, ‘কয়েক মাস আগে ভারতবিরোধী ও মুক্ত গণমাধ্যমবিরোধী চরমপন্থীদের অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়া ভবনের ভেতরেই একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করার সিদ্ধান্তটি একই সঙ্গে সাহসী ও অনুপ্রেরণামূলক। যাঁর মাথায় এই পরিকল্পনাটি এসেছে, তিনি সর্বোচ্চ প্রশংসার দাবিদার, আর যে শিল্পী একে প্রাণ দিয়েছেন, তিনি পাওয়ার যোগ্য জোরালো স্বীকৃতি।’
.আমি আজ (শুক্রবার) প্রদর্শনীটি পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। এটি কতটা বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনশীল এবং গভীর চিন্তাপ্রসূত, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রদর্শনীটি ধ্বংসলীলাকে ভাবনায় আর ক্ষতকে অর্থবহ করে তুলেছে। সচরাচর এমন কিছু আপনি দেখতে পাবেন নাডেভিড বার্গম্যান, ব্রিটিশ সাংবাদিক
বার্গম্যান আরও লেখেন, ‘আমি আজ (শুক্রবার) প্রদর্শনীটি পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। এটি কতটা বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনশীল এবং গভীর চিন্তাপ্রসূত, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রদর্শনীটি ধ্বংসলীলাকে ভাবনায় আর ক্ষতকে অর্থবহ করে তুলেছে। সচরাচর এমন কিছু আপনি দেখতে পাবেন না।’
রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে দুই মেয়ে লাবিবা হাসান টিয়া ও আরিবা হাসান কেয়াকে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি দেখতে আসেন শেখ ইমরুল হাসান। তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন মুক্তকণ্ঠ পড়ি; আমার বাচ্চারাও পড়ে। তারা এনজয় করে মুক্তকণ্ঠ। সে মুক্তকণ্ঠের কার্যালয় এভাবে পুড়িয়ে ফেলা দুঃখজনক; এটা অপরাজনীতির শিকার।’
.লাবিবা জানায়, সে এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে মুক্তকণ্ঠ পত্রিকা পড়ে। পঞ্চম পাতার কৌতুক এবং গোল্লাছুট তাঁর অনেক পছন্দের। প্রদর্শনী ঘুরে দেখে লাবিবা বলে, ‘গত ডিসেম্বর মাসে যে ঘটনাটা হলো, সেটা আসলে খুবই দুঃখজনক। আজকে এখানে দেখে খুবই খারাপ লাগল।’
.ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিকুন নাহার স্বর্ণালী বলেন, ‘প্রদর্শনী দেখে সেই রাতের ভয়াবহতার কিছুটা অনুভব করতে পেরেছি। আগুন লাগার সময় ভেতরে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অভিজ্ঞতার কথাও ভিজ্যুয়ালের মাধ্যমে শুনেছি। এসব দেখে গা শিউরে উঠেছে। যারা এ কাজ করেছে, তারা একদমই ঠিক করেনি। কিন্তু আমরা সব কথা ঠিকমতো বলতে পারি না; জীবনের ঝুঁকি আছে। নিজের ভাষায় বললে অনেকে নিতে পারবে না, নানা ট্যাগ দেওয়া হবে।’
এ ধরনের ব্যতিক্রমী আয়োজনের প্রশংসা করলেন জান্নাতুল তাসমিয়া নামের আরেক শিক্ষার্থী। ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি বলেন, ‘এটা আসলে কখনোই হওয়ার ছিল না। যাদের মধ্যে দেশপ্রেম আছে, দেশের মানুষ হিসেবে সেটা ধর্মীয় দিক থেকে হোক বা যেদিক থেকেই হোক, ধ্বংসযজ্ঞ চালানো কোনো মানবতার মধ্যেই পড়ে না।’
.জুলিয়েট মণ্ডল নামের এক দর্শনার্থী বলেন, ‘অনেক সময় আমরা ঘটনাগুলো দেখলেও সেগুলোকে মন থেকে অনুধাবন করতে পারি না। কিন্তু ঘটনার পরে এভাবে একটা ধ্বংসস্তূপকে যে নতুন করে শিল্পের রূপ দিয়ে মানুষের কাছে তুলে ধরা যায়, এই বিষয়টি আমাকে বেশ আন্দোলিত করেছে। কিন্তু এই (ধ্বংসযজ্ঞের) ঘটনাগুলো যাঁরা ঘটিয়েছেন, তাঁদের চিন্তাচেতনা কখনোই ভালো থাকে না। আশা করি, ভবিষ্যতে যাতে এমন কর্মকাণ্ড আর না ঘটে।’
.প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন দুই সহপাঠী আফরিন মাহমুদ ও সুমাইয়া ফাতেমা। তাঁরা রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী। প্রদর্শনী ঘুরে দেখে আফরিন মাহমুদ বলেন, ‘হয়তো বা কোনো নিউজ প্রচার হয়েছে, সেটির ওপর ক্ষোভ থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিল্ডিংয়ে ওপর তো কেউ এ রকম ক্ষোভ দেখাতে পারে না। এটা কোনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। এই সিস্টেম বা ক্ষোভ প্রকাশের সিস্টেমের পরিবর্তন হোক। আর মুক্তকণ্ঠ ধ্বংসযজ্ঞকে যে শৈল্পিক রূপ দিয়েছে, সেটি অনন্য। শৈল্পিক রূপ ভাঙার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ।’
শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের তৈরি করা ‘আলো’ শীর্ষক এই প্রদর্শনী শুরু হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অগ্নিদগ্ধ ভবনটিতে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। এই প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।






