প্রাচীন মসজিদটির উপরিভাগে একটি বড় গম্বুজ। চার কোনায় চারটি ছোট গম্বুজ। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ছয় ফুট। ইমামসহ একসঙ্গে চার থেকে পাঁচজন নামাজ পড়তে পারেন। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরেও তালিকাভুক্ত। দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। মসজিদটি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌরসভার নুনিয়াগাড়ি এলাকায় অবস্থিত। মসজিদের এক পাশে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক। অন্য পাশে পলাশবাড়ী-ঘোড়াঘাট সড়ক। দুই সড়কের মাঝে নির্মিত মসজিদটি গাইবান্ধার সবচেয়ে ছোট মসজিদ। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গাইবান্ধার উপপরিচালক মিরাজুল ইসলাম বলেন, গাইবান্ধায় ছোট-বড় মিলে ৫ হাজার ৮৪৭টি মসজিদ আছে। জেলায় এ রকম ছোট মসজিদ আর নেই।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটে মসজিদটি কাদির বকস মন্ডলের মসজিদ হিসেবে লিপিবদ্ধ। স্থানীয়ভাবে সবাই ‘ছোট মসজিদ’ নামে চেনেন। এ মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়া হয় না। মাঝেমধ্যে বিশেষ নিয়ত করে এসে কেউ কেউ নামাজ পড়েন। ছোট মসজিদ ঘেঁষে আছে আরেকটি বড় মসজিদ। বড় মসজিদ কমিটির লোকজনই সেটি দেখভাল করেন। দুই বছর আগে ছোট মসজিদটি নতুন করে রং করা হয়।

বড় মসজিদের ইমাম মো. নুরুননবী মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বড় মসজিদেই মূলত পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমার নামাজ আদায় করা হয়। ছোট মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়া হয় না। একসঙ্গে চার থেকে পাঁচজন নামাজ পড়তে পারেন। মাঝেমধ্যে দূরদূরান্তের লোকজন এসে নিয়ত করে ছোট মসজিদে নামাজ আদায় করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রাচীন স্থাপত্য নকশায় তৈরি মসজিদের দরজা লোহার তৈরি করা। দরজার ওপরে দৃষ্টিকাড়া নকশা। ভেতরে আরবি হরফ। এক পাশেই বড় মসজিদ। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, মসজিদটি নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই।

মসজিদটি ঠিক কবে, কখন নির্মাণ করা হয়েছে, সে ব্যাপারে বিভিন্ন জনশ্রুতি আছে। আনুমানিক ২০০ বছর আগে এক রাতে অলৌকিকভাবে মসজিদটি তৈরি হয় বলেও আলোচনা আছে।

তবে ২০১৩ সালের ২৯ আগস্ট (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৪২) প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটে ছোট মসজিদ নিয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়, ‘এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটিতে ইট ও চুন–সুরকির গাঁথুনি পরিলক্ষিত হয়। মসজিদের সম্মুখের চুনাবালির মিশ্রণে তৈরি ফুল ও লতাপাতার অলংকরণ আছে। সম্ভবত অলংকরণের ওপর পরে আধুনিক রঙের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে ক্ষুদ্রাকৃতির মিহরাব ও দক্ষিণ দেয়ালে মিম্বর আছে। গম্বুজের নিচে চার কোনার পেন্ডেটিভ দেখা যায়। গম্বুজের ভেতর গোলাকার; কিন্তু উপরিতল বহু খাঁজবিশিষ্ট। কার্নিশে ছোট ছোট মারলন ডেকোরেশন আছে। কাদির বকস নামকরণ থেকে অনুমিত হয়, কাদির মন্ডলের পূর্বসূরিরা কেউ এটা নির্মাণ করতে পারে। নির্মাণশৈলী ও মসজিদ কাঠামোয় ব্যবহৃত উপাদান থেকে জানা যায়, মসজিদটি ব্রিটিশ আমলে খুব সম্ভবত ১৮ শতকের শেষভাগে বা ১৯ শতকের প্রথমভাগে এটি নির্মাণ করা হয়।’

মসজিদের অদূরে পলাশবাড়ী ডিগ্রি মহিলা কলেজ। কলেজের অধ্যক্ষ আবু সুফিয়ান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিভিন্নজন মসজিদটির বিভিন্ন নাম বলে থাকেন। এটি ছোট মসজিদ নামেই বেশি পরিচিত। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় স্থানীয় ও সরকারিভাবে মসজিদটির ইতিহাস উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চালানো হয়। সেই চেষ্টা এখনো চলছে।

নুনিয়াগাড়ি বড় মসজিদ কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন মণ্ডল বলেন, ছোট মসজিদটি সংরক্ষণে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়। ২০১৩ সালের ২ জুন মসজিদটি নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তদন্ত করে। তখন মসজিদটিকে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পরে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে জানা যায়নি।

জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নথিতে ছোট মসজিদটি ‘কাদির বক্স মন্ডলের মসজিদ’ নামে লিপিবদ্ধ আছে। এ ছাড়া প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের রংপুর বিভাগের প্রাচীন স্থাপত্যের তালিকাতেও মসজিদটির নাম আছে। ভবিষ্যতে এটি রক্ষণাবেক্ষণে অধিদপ্তরের পরিকল্পনা আছে।