পাঠকমাত্রই জানেন, বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস হলেন প্রাক্–চৈতন্য যুগের দুজন বিখ্যাত বৈষ্ণব পদকর্তা। জ্ঞানদাসকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য বলা হয়। দুজনের মধ্যে কে যে শিরোনামের পঙ্ক্তির মূল লেখক, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর তর্কবিতর্ক মতান্তর আছে। ‘সুখের লাগিয়া…’ গীতি কবিতাটির মূল রচয়িতা যিনিই হন, গীতিকবিতাটির ভাবার্থ নিয়ে কারও কোনো দোটানা নেই। পঙ্ক্তিতে সুখের আশায় করা প্রচেষ্টা বা অমৃত সাগরে স্নান করতে গিয়ে উল্টো বিষ বা দুঃখ পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী চেয়ারে বসতে না বসতে চাঁদাবাজির যে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা শুনে অনেকেই ‘সংজ্ঞা’ হারিয়েছেন। দুর্নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘টিআইবি’ সংজ্ঞা না হারালেও শঙ্কা প্রকাশ করেছে। সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যেই গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ‘চাঁদাবাজির মতো একটি অপরাধকে ভিন্ন ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করে বৈধতার আবরণ দেওয়ার চেষ্টা দুর্নীতিবিরোধী ঘোষিত অবস্থানের পরিপন্থী।
এতে শুধু পরিবহন খাত নয়, রাষ্ট্রীয় সেবা ও উন্নয়নব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দুর্নীতিকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রবণতা শক্তিশালী হতে পারে।’ টিআইবি বেশ জোরেশোরেই জানায়, নবগঠিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সেই ঘোষণার অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবহন খাতে বহুল আলোচিত চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
.অবৈধকে বৈধতার আবরণ দেওয়ার পূর্বনজির
একদা আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে প্রবীণ, মেধাবী ও অভিজ্ঞ অর্থমন্ত্রী (‘রাবিশ’ ও ‘বোগাস’ শব্দ দুটো তাঁর ট্রেডমার্ক হয়ে গিয়েছিল) আদর করে ঘুষের নাম দিয়েছিলেন ‘স্পিড মানি’। তিনি কথা বলতে পছন্দ করতেন। বেশি বলার ঝোঁক থেকেই হোক বা মশকরা করার লোভ থেকেই হোক বলে ফেলেছিলেন, ঘুষ তেমন খারাপ কিছু নয়।
তৈরি পোশাক কারবারিদের যে অনুষ্ঠানে (নভেম্বর ২০১৪) তিনি এটা বলেছিলেন, সেদিন তিনি বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছিলেন। পোশাক কারবারিদের মাত্র ২ শতাংশ সুদে ইমারত নির্মাণের ঋণ সমঝোতা স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে সবারই বাকবাকুম অবস্থা।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, ‘সেখানে অনেক কাজ করতে গেলে তা এজেন্টের মাধ্যমে করতে হয় এবং এজেন্টরা এ কাজ অর্থের বিনিময়ে করে থাকেন, যা সেখানে স্পিড মানি হিসেবে পরিচিত। এটা সে দেশে অবৈধ নয়। সেখানে সেবার পরিবর্তে দাম দেওয়ার রেওয়াজ আছে।’
ওই রাতে একটি অনলাইন পত্রিকায় অর্থমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে ‘ঘুষ অবৈধ নয়’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। রাতে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে আলোচনায় মন্ত্রী ওই মন্তব্য করেছেন বলে তাঁর সমালোচনা করা হয়। প্রবীণ মন্ত্রী মেজাজ হারান।
.কোনো কোনো রসিক মিডিয়াকর্মী প্রস্তাব করেন, সুইস ব্যাংক, কানাডার বেগমপাড়াসহ বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকে ‘পাচার’ না বলে ‘লেনদেন’ বলা হোক। মজার পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে কেউ কেউ বলছিলেন, পাচার-লেনদেন না বলে ‘টাকা রপ্তানি’ বলে দেওয়া আরও ভালো।.
তিনি পরের কয়েক সপ্তাহ সব কটি সভায় অতিথির ভাষণে বিষয়টি ‘ক্লিয়ার’ করতে থাকেন, বলতে থাকেন, ‘ঘুষ অবৈধ নয়—এ কথা আমি বলিনি, বলতে পারি না। মিডিয়া আমার মূল বক্তব্য থেকে সরে গিয়ে মনগড়া, অবান্তর কথাবার্তা অত্যন্ত অশালীন-নোংরাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাবিশ! আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমি সব সময়ই সোচ্চার ছিলাম, আজীবন থাকব।আমার মুখ দিয়ে এ ধরনের কথা বের হওয়ার প্রশ্নই আসে না।’ ইত্যাদি।
তাঁর নেকনজরে পড়ার জন্য এ সময় কতিপয় আমলাও তাঁকে উদ্ধারের জন্য গামছা গলায় নেমে পড়েন। বোমা ফাটানো মত দেন ওই সময়কার দুদকের চেয়ারম্যান, ‘সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে ঘুষ খেলে অপরাধের মধ্যে পড়বে না, সেটা প্যানাল কোড সিআরপিসিতে আছে।’ তাঁর এ মন্তব্য নিয়েও বিস্তর রঙ্গব্যঙ্গ হয়।
কোনো কোনো রসিক মিডিয়াকর্মী প্রস্তাব করেন, সুইস ব্যাংক, কানাডার বেগমপাড়াসহ বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকে ‘পাচার’ না বলে ‘লেনদেন’ বলা হোক। মজার পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে কেউ কেউ বলছিলেন, পাচার-লেনদেন না বলে ‘টাকা রপ্তানি’ বলে দেওয়া আরও ভালো।
কবিযশপ্রার্থী আমলাদের একজন তাঁর বেনামি ফেসবুকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘যেখানে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই বুদ্ধিমান লোকটি লিখে গেছেন যে ঠোঁটের ডগায় যদি মধু ধরা হয়, তো সেই মধু একবার চেখে দেখবে না, এমন মানুষ ভূভারতে নেই।’
.বলে রাখা ভালো এই বিশ্লেষণে কৌটিল্য যে বার্তা বা পরামর্শ দিতে চেয়েছিলেন, সেটা হচ্ছে, দেশের রাজার কাজ হলো যাতে সরকারি কর্মচারী, রাজসভাসদ ও সীমান্ত প্রহরীরা তাঁদের ইচ্ছামতো টুপাইস হাতিয়ে না নেন, তা নিশ্চিত করা।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রায় একই সময়ে দুর্নীতি আর হরিলুট বিষয়ে আপডেট তত্ত্ব জানিয়েছিলেন আরেক সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতি আর হরিলুটের মধ্যে তফাত রয়েছে। দেশে কোনো হরিলুট হচ্ছে না। যা হচ্ছে, সেটা টুকটাক লুটপাট।
সহনীয় ঘুষের ফতোয়া
সাবেক বামপন্থী ও তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ কর্মকর্তাদের ‘সহনীয় মাত্রায় ঘুষ’ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। শিক্ষা ভবন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) কর্মকর্তাদের ল্যাপটপ বিতরণ অনুষ্ঠানে দুর্নীতির প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এই পরামর্শ দিয়েছিলেন। মান্যবর অর্থমন্ত্রীর কথার ওপর কথা চলে না।
তিনিই যখন স্পিড মানি মেনে চলার পক্ষে, তখন সাদাসিধা শিক্ষামন্ত্রীর আর কী করার থাকে! কর্মকর্তাদের উদ্দেশে শেষমেশ বলেই ফেলেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা ঘুষ খাবেন, তবে সহনশীল হইয়্যা খাবেন। যদি বলি, আপনারা ঘুষ খাইয়েন না, তাহলে সেটা অর্থহীন কথা হবে।’
.চাঁদাবাজি বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে.তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলে খাম তৈরি করা থাকে, আপনার কাজ হলো আপনি গেলেন, গেলে আপনার খামটা আপনার হাতে ধরাইয়া দিলে আপনি খাইয়্যাদাইয়্যা তারপর আসার সময় চলে আসবেন। আইস্যা রিপোর্ট দেবেন, ঠিক আছে।’ সেদিন তিনি মন খুলেই বলেছিলেন, ‘খালি যে অফিসার চোর তা না, মন্ত্রীরাও চোর, আমিও চোর। সবাইকে আমাদের পরিবর্তন করতে হবে।’
তাহলে কি...
তাহলে কি ঘুষ, ঘুষি, দুর্নীতি, লেনদেন, বিনিময়, হাদিয়া, নজরানা, স্পিড মানি, গিফটের ধামাকা, টুকটাক লুটপাট, সমঝোতার লেনদেন ওরফে চাঁদাবাজি কি সামনে আরও বাড়বে? অফিস-আদালতে ঘুষের আলগা কামাই, সরল বিশ্বাসে ঘুষ অর্ঘ্য উপরি, ইনাম, গিফট, উপহার ইত্যাদি সোহাগি নামে ভেসে যাবে? জনগণ নতুন কায়ায় আগের ছায়া দেখলে হতাশ হবে, মন খারাপ করবে।
নতুন সরকার কি নতুন জনপ্রত্যাশার কথা শুনতে পাচ্ছে?
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক
ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব






