কোথাও পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, কোথাও ভাঙা টেবিল–চেয়ার। আছে পুড়ে যাওয়া বই, নথিপত্র। উগ্রবাদীদের হামলার শিকার মুক্তকণ্ঠ ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী এই শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবনে আয়োজিত এই শিল্প–প্রদর্শনী দেখতে আজও মানুষ ভিড় করছেন। বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় প্রদর্শনী। চলে বেলা ১টা পর্যন্ত।

দর্শনার্থীরা গণমাধ্যমে হামলা ও অগ্নিসংযোগের নিন্দায় সরব হয়েছেন। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

দুপুরে প্রদর্শনী দেখতে আসেন গ্যালারি কায়ার কর্ণধার চিত্রকর গৌতম চক্রবর্তী। তিনি পুড়ে যাওয়া ভবন ও শিল্প–প্রদর্শনী দেখে বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠের এই ভবনে আমি আগেও এসেছিলাম। কিন্তু আমার জন্য এটা দুর্ভাগ্যের, এমন ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হতে হবে, এটা কখনো ভাবনায়ও আসেনি।’

যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম থেকে পৃথিবী যেমন শিক্ষা নেয়নি, মুক্তকণ্ঠের এই পুড়ে যাওয়া ভবন ও প্রদর্শনী থেকে বাংলাদেশের মানুষ শিক্ষা নেবে কি না, সেটাও সময় বলে দেবে বলে মনে করেন এই চিত্রকর।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে গৌতম চক্রবর্তী বলেন, ‘স্বাধীনতা খুব স্বতঃস্ফূর্ত একটি বিষয়। এটা কেউ কাউকে দিয়ে দেয় না। অর্জন করে নিতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা বলার সুযোগ নেই যে, আমরা স্বাধীন। ভবিষ্যতে আমাদের এই স্বাধীনতা অর্জিত হবে কি না, তা–ও সময় বলে দেবে।’

এই চিত্রশিল্পী বলেন, ‘মুষ্টিমেয় মানুষ যা সৃষ্টি করে কুশিক্ষিত বা অশিক্ষিত সমাজ সেটাকে ধ্বংস করবে। এটাই রীতি। সর্বত্রই এটা প্রচলিত। আমাদের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি সত্য।’

শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান ‘আলো’ নামের এই শিল্প–প্রদর্শনী করেছেন। এটি শুরু হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা ও বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এ প্রদর্শনী। চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

প্রদর্শনী দেখতে প্রতিদিন রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে মানুষ। সকালে প্রদর্শনী দেখতে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান।

প্রদর্শনী দেখে ডিসি ইবনে মিজান বলেন, ‘যারা এই ধ্বংসাত্মক কাজটি করেছে, তারা একটা নিকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করল। এখানে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, প্রদর্শনীটি সেই ধ্বংসযজ্ঞকে ফুটিয়ে তুলেছে। যাঁরা আসবেন, প্রদর্শনী দেখে তাঁরা উপলব্ধি করতে পারবেন যে ভবনটিতে আসলে কী ঘটেছিল। এই অনুভূতি যে কাউকে আবেগতাড়িত করবে।’

সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা জরুরি বলেন ডিসি ইবনে মিজান। ভিন্নমতকে যাতে কখনো ধ্বংসাত্মকভাবে দমন করা না হয়, জাতি হিসেবে সেই চিন্তাও লালন করতে হবে বলেন তিনি।

প্রদর্শনী দেখতে সিরাজগঞ্জ থেকে আসেন প্রদীপ সাহা। তিনি বলেন, ‘গত ১৮ ডিসেম্বর যখন এই ভবনে আগুন দেয়, তখন স্তব্ধ হয়ে যাই। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন, কিছুই করার ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘প্রদর্শনীটা ইতিবাচক এই অর্থে যে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও শিল্পকর্ম হতে পারে, এটা তারই প্রমাণ। যাঁরা ধ্বংসাত্মক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল, দ্রুত তাঁদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়, সেই দাবি করছি।’

সোনালী ব্যাংকের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক গোলাম সারওয়ার আসেন প্রদর্শনী দেখতে। তিনি বলেন, ‘যে নিকৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, কোনো সভ্য সমাজ এটাকে সমর্থন করে না। মুক্তকণ্ঠ শুধু একটি সংবাদমাধ্যম নয়। এটি কালের সাক্ষী।’

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ থেকে একদল শিক্ষার্থী আসেন শ্রেণি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। তাঁরা মুক্তকণ্ঠের পুড়ে যাওয়া ভবন ও প্রদর্শনী নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজ করবেন। তাঁদের একজন নুরে সুবাহ বিভা। প্রদর্শনী দেখে তিনি বলেন, মানুষ যখন মনস্টার হয়ে যায়, তাদের যখন মনুষ্যত্ব হারিয়ে যায়, তখনই কেবল এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। এই ধ্বংসযজ্ঞটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অংশ। কিন্তু প্রদর্শনীর মাধ্যমে মুক্তকণ্ঠ নতুন করে বার্তা দিয়েছে যে আলোকে কখনো আগুন দিয়ে স্তব্ধ করা যায় না।

শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির হায়দার চৌধুরীর ছেলে লেখক ও গবেষক আসিফ মুনীর আসেন প্রদর্শনী দেখতে। প্রদর্শনী দেখে তিনি বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠের ওপর যে ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চালানো হয়েছে, প্রদর্শনীটি তারই সৃজনশীল প্রত্যুত্তর হয়েছে। যারা মুক্তকণ্ঠকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, তারা যেন এই বার্তাটি নেয়, গণমাধ্যমকে দামিয়ে দেওয়া যায় না।’

শহীদ বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ছেলে এবং কাজী ফুডস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হায়দার চৌধুরী প্রদর্শনী দেখে বলেন, ‘আমরা জানতাম অনেক দিন থেকেই মুক্তকণ্ঠের বিরুদ্ধে এমন একটি ক্যাম্পেইন করা হয়েছিল। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের আক্রমণটা খুব সংঘবদ্ধ ছিল। এত বড় একটা ভবনকে তারা মুহূর্তেই যেভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করল, এটা দেশের গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।’

এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তানভীর হায়দার চৌধুরী। তিনি আরও বলেন, ‘না হলে আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যাবে।’