সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার মুক্তকণ্ঠ ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে এই শিল্প-আয়োজনে দর্শনার্থীরা দেখছেন পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্র ইত্যাদি।
প্রদর্শনীর তৃতীয় দিনে ব্যতিক্রমী এ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’ দেখতে এসেছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। প্রদর্শনী ঘুরে দেখে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের বাইরে থেকে ধারণা ছিল না যে ভেতরে ধ্বংস এত ভয়াবহ হয়েছে। সুতরাং এটা দেখে বিস্মিত হয়েছি একদিকে, আবার অন্যদিকে অনুপ্রেরিত হয়েছি যে এই ধ্বংস থেকে আবার যে জেগে ওঠা, ধ্বংস থেকে সৃষ্টি এটাই—প্রদর্শনী পথ দেখাচ্ছে।’
এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মতে, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আটকাতে যতই চেষ্টা করা হোক, শেষ পর্যন্ত দমিয়ে রাখা যায় না। সত্য প্রকাশিত হবেই। সুতরাং মুক্তকণ্ঠের এটাও প্রমাণ করে যে সভ্যতাকে কখনো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া যায় না। সভ্যতা আপন শক্তিতে জেগে উঠবে।’
মুক্তকণ্ঠয় হামলার ফলে সেই রাতে মুক্তকণ্ঠের অনলাইন সংবাদপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। মুক্তকণ্ঠের ২৬ বছরের প্রকাশনার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৯ ডিসেম্বর ছাপা পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ থাকে। তবে এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও মুক্তকণ্ঠ ঘুরে দাঁড়ায়। মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে আবার অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর সকালে সারা দেশের পাঠকেরা ছাপা পত্রিকা হাতে পেয়ে যান।
অগ্নিকাণ্ডকবলিত ভবনটি নিয়ে শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের ‘আলো’ নামের এই প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সর্বস্তরের দর্শকদের জন্য প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। শিল্প-আয়োজনটি সবার জন্য উন্মুক্ত।
প্রদর্শনী দেখতে এসে শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের প্রশংসা করেন চিত্রশিল্পী শহীদ কবীর। তিনি বলেন, এটি একটি বিশ্বমানের প্রদর্শনী হচ্ছে। মুক্তকণ্ঠসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বাঙালি জাতির যে কৃষ্টি, যে সংস্কৃতি—এটা কোনোভাবে কোনো অপশক্তি ধ্বংস করতে পারবে না।’
হামলার শিকার মুক্তকণ্ঠের ভবনটিতে প্রবেশ করতেই এখনো পোড়া গন্ধ আসে। প্রবেশ করে বাঁ দিকে গেলে কিছু চিত্রকর্ম। একটি চিত্রকর্মে দেখা যায়, পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া একটি ভবন। আরেকটি চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে পোড়া ভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাঁড়িয়ে আছে—আরেকটি চিত্রকর্মে এমনটি উঠে এসেছে।
চারজন মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে—এমন স্থাপত্যও রয়েছে সেখানে। চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যের পাশাপাশি সেখানে রাখা হয়েছে মুক্তকণ্ঠের পুড়ে যাওয়া কম্পিউটারসামগ্রী ও আসবাব।
প্রদর্শনীর দোতলায় পোড়া বই প্রদর্শন করা হয়েছে। আগুনে যেসব বই পোড়েনি, সেগুলোই প্রদর্শন করা হয়েছে। অক্ষত বইয়ের প্রদর্শনীতে লেখা—‘এই মহাসাগরে স্নান করে জাগোরে’। দোতলার নথিপত্র, বই, আসবাব, যন্ত্রাংশসহ যাবতীয় ধ্বংসস্তূপের ওপর রয়েছে সাদা কফিন।
মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলা ও ভাঙচুরের সময় উগ্রবাদীদের কেন থামানো গেল না এমন প্রশ্ন তুলে শিল্পী রিতু সাত্তার বলেন, ‘খবরের কাগজ তাঁর পাঠকের সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করে, সেটি কখনো কখনো পাঠকের মতের সঙ্গে না–ও মিলতে পারে। তাই বলে ভেঙে দেওয়া বা পুড়িয়ে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।’ প্রদর্শনী দেখতে এসে তিনি এ ঘটনাকে এক কথায় ‘হতোদ্যম অবস্থা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ভাঙচুর ও হামলার এক দিন পর পত্রিকা হাতে পেয়ে তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন।
তৃতীয় তলায় পুড়ে যাওয়া লোহালক্কড় প্রদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি এই ফ্লোরের পোড়া বৈদ্যুতিক তার এবং অন্যান্য জিনিসও আছে। ওই সময় মুক্তকণ্ঠের যেসব কর্মী ভবন পুড়তে দেখেছেন, তাঁদের বক্তব্যও প্রদর্শিত হচ্ছে।
ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করেন মনির মহিউদ্দিন। রাজধানীর কলাবাগান এলাকা থেকে আজ সকালে এসেছেন মুক্তকণ্ঠের দগ্ধ ভবন দেখতে। ঘুরে ঘুরে পুরো ভবন দেখার পর তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যারা এসব কাজ করে, তারা আসলে কোন বিবেচনায় এসব করে, তা তিনি বুঝে উঠতে পারেন না। এসব কাজ, এদের কোনো কাজই আমার সহ্য হয় না।’ নিজের কাজের পাশাপাশি রাজধানীর সব ধরনের প্রদর্শনীতে যাওয়া হয় জানিয়ে মুক্তকণ্ঠের এ প্রদর্শনীকে ব্যতিক্রম বলে আখ্যায়িত করেন তিনি।
চতুর্থ তলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে মুক্তকণ্ঠ ভবনে হামলার ভিডিও চিত্র। সেই সঙ্গে চতুর্থ তলায় উগ্রবাদীরা যে লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে, তা–ও প্রদর্শিত হচ্ছে। ভাঙচুর করা ও এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্রের ওপর রয়েছে একঝাঁক কবুতর।
বেসরকারি চাকরিজীবী মো. রবিউল ইসলাম ও ব্যবসায়ী শাকিল হক দুই বন্ধু, তাঁরা শুক্রবার সকালে একসঙ্গে এসেছেন মুক্তকণ্ঠের দগ্ধ ভবনের ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’ দেখতে। মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ‘বিস্মিত’ হয়েছেন জানিয়ে মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘হামলার পরদিন ১৯ ডিসেম্বর মুক্তকণ্ঠের ছাপা পত্রিকা না পাওয়ায় অনেক খারাপ লেগেছিল। এর পর দিন পত্রিকা পেয়ে আনন্দিত হয়েছি।’ নিজের ঢাকা ও খুলনার বাসায় নিয়মিত মুক্তকণ্ঠ রাখা ও পড়ার কথা জানিয়েছেন এই পাঠক।






