টেস্ট ক্রিকেটে একটি ইনিংসে ৫টি উইকেট নেওয়ার অভিজ্ঞতা হাসান মাহমুদের জন্য মোটেই নতুন কিছু নয়। এর আগে পাকিস্তান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতেই তিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান পেসারদের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশিবার ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডটি এখন তাঁর দখলে। তবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে একটি জায়গাতেই ছিল তাঁর বড় অপ্রাপ্তি—দেশের মাটিতে কখনো ৫ উইকেট পাননি তিনি।

অবশেষে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটল আজ। সিলেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট শিকার করে নিজের স্বদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো ৫ উইকেট পাওয়ার স্বাদ পেলেন হাসান। এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে, ভারতের বিপক্ষে চেন্নাইয়ে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবিতে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। এবার সেই বিশেষ তালিকায় যুক্ত হলো সিলেটের নামও।

দেশের মাটিতে এমন এক অনন্য অর্জনের আনন্দ সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করেছেন হাসান। তিনি বলেন, “দেশের মাটিতে ৫ উইকেট পাওয়াটা সব সময় আমার জন্য খুব স্পেশাল। যেহেতু নিজেদের মাঠে ভালো একটা সুযোগ ছিল, তাই এটা (করতে পারাটা) অনেক আনন্দের।”

তবে আজকের দিনে কেবল ব্যক্তিগত অপ্রাপ্তি ঘোচানোই নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটের এক বিরল কীর্তিতেও নাম লিখিয়েছেন এই বাংলাদেশি পেসার। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচবার ভিন্ন ভিন্ন দেশে ইনিংসে ৫ উইকেট পাওয়ার অনন্য রেকর্ডটি এতদিন কেবলই ছিল অস্ট্রেলিয়ান বোলার নাথান লায়নের দখলে। এবার সেই অভিজাত তালিকায় যোগ হলো হাসানের নাম। ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন কন্ডিশনে একই রকম সাফল্য অর্জন করা সহজ কথা নয়। তবে হাসান এই বিষয়টিকে খুব বেশি জটিল করে দেখতে চান না। তিনি বলেন, “আমি বিষয়গুলো খুব সহজভাবে দেখি। সামনে আরও বড় কিছু অর্জনের চেষ্টা করে যাব। যত দিন টেস্ট ক্রিকেট খেলব, তত দিনই চেষ্টা থাকবে আরও ভালো করার। ৫ উইকেট পাওয়া সব সময়ই বিশেষ কিছু। ভবিষ্যতেও এমন অর্জনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাব।”

আজকের দিনটি বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের ইতিহাসেও এক বিশেষ স্থান করে নেবে। কারণ, প্রথমবারের মতো কোনো বাংলাদেশি পেস বোলারের বলে টেস্ট ম্যাচে স্টাম্পিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। হাসানের বলে জশুয়া বিশপকে স্টাম্পড করেছেন লিটন দাস।

এই বিশেষ ঘটনার পেছনে ছিল একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। ব্যাটসম্যান তখন ক্রিজ ছেড়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে এসে খেলছিলেন। বিষয়টি লক্ষ্য করে কৌশল পরিবর্তনের কথা ভাবেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। তিনি হাসানকে পরামর্শ দেন যে, লিটন যদি উইকেটের কিছুটা সামনে দাঁড়িয়ে কিপিং করেন, তবে ব্যাটসম্যানের পায়ের মুভমেন্টে পরিবর্তন আসতে পারে এবং তাঁর শট খেলার প্রবণতাও কমে যেতে পারে।

হাসানও এই পরিকল্পনায় একমত হন। তাঁর ভাষায়, “ওই সময় ব্যাটসম্যান আসলে একটু এগিয়ে এসে খেলছিল। পরে (নাজমুল) শান্ত ভাই আমাকে বলেন, যদি একটু সামনে গিয়ে কিপিং করে, তাহলে হয়তো ব্যাটসম্যানের পায়ের মুভমেন্টে পরিবর্তন আসবে, শট খেলার প্রবণতাও কিছুটা কমবে। আমি তখন দাদাকে (লিটন) বলি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে দাঁড়াতে।” শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনাটি সফল হয় এবং লিটনের হাতেই ধরা পড়েন বিশপ।

হাসানের ৬ উইকেটের দাপটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস ৩৫৬ রানেই থেমে যায়। তবে বোলারদের এই দুর্দান্ত সাফল্যের পর ব্যাট হাতে বাংলাদেশের শুরুটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। ৭ উইকেট হারিয়ে স্বাগতিকরা এখনো ২৬৮ রানে পিছিয়ে আছেন।

দিনের শেষ বিকেলে কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছেন মুশফিকুর রহিম ও তাওহিদ হৃদয়। এই দুজনের মধ্যে ৩৭ রানের একটি অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে দিন শেষ করেছে বাংলাদেশ। তৃতীয় দিনে এই জুটির ওপরই ভরসা রাখছেন হাসান। তাঁর বিশ্বাস, মুশফিক ও হৃদয় ক্রিজে টিকে থাকতে পারলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান টপকে যেতে পারবে বাংলাদেশ।

হাসান বলেন, “আমার মনে হয়, এখন যে জুটিটা হয়েছে মুশফিক ভাই ও হৃদয়ের, যদি এটা ধরে রাখতে পারে, তাহলে আমরা লিড নিতে পারব। আশা করি, ওদের রান টপকে যেতে পারব। উইকেট এখন পর্যন্ত ভালো। স্পিন কিংবা পেস, কোনো দিক থেকেই খুব বেশি সমস্যা হয়নি। শুরুর দিকে নতুন বলে কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে এখন আমার মনে হয়, ব্যাটসম্যানরা যদি মনোযোগ ধরে রেখে খেলতে পারে, তাহলে আমরা ভালোভাবে শেষ করতে পারব।”