বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট খরা, বন্যা এবং তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে প্রায় ৯ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে পড়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর আজ শুক্রবার এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি অর্থায়নের প্রয়োজন।
ইউএনএইচসিআরের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মতো চরম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বর্তমানে বসবাস করছেন।
তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এর প্রাক্কালে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যকার গভীর ও জটিল সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে যেসব দেশ শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আসছে, সেখানে জলবায়ু ঝুঁকি আরও প্রকট হতে পারে।
ইউএনএইচসিআরের সহকারী হাইকমিশনার (কার্যক্রম) আন্তন লেইস গার্সিয়া বলেন, “সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির শিকার এলাকাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যেসব জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন, তাদের কাছে জলবায়ু তহবিল পৌঁছানো জরুরি।”
ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য নিজ দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করা এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্যানুসারে, নিজ দেশে ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এমন সব দেশে ফিরেছেন, যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়ায় সম্প্রতি প্রায় ৪০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ তাদের পুরনো বাড়িতে ফিরেছেন। তবে সেখানে পানির তীব্র সংকট বাড়ছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া গত মে মাসে ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ পুনরায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ভবিষ্যতের ঝুঁকি সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রতি তিনটি শরণার্থীশিবিরের একটিতে বছরে অন্তত ১০০ দিন বিপজ্জনক তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে। ইথিওপিয়ার হেলাওয়েইনসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট শরণার্থীশিবিরে বছরে ২০০ দিনের বেশি সময় তীব্র গরম থাকতে পারে, যা হিটস্ট্রোক এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, শরণার্থীদের অনেকেরই শীতল পরিবেশ, পর্যাপ্ত পানি এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে প্রচণ্ড গরম থেকে নিজেদের রক্ষা করা তাঁদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সংস্থাটি পুনরায় সতর্ক করে জানিয়েছে যে, এশিয়ার বিভিন্ন অংশে খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হলে আশ্রয়দাতা দেশগুলোর ঝুঁকি বাড়বে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান ও উগান্ডায় ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কপ৩১ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সরকার এবং জলবায়ু অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অভিযোজন কার্যক্রমে অর্থায়ন বাড়ানোর জোরালো আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ১০ শতাংশের মতো সংঘাত ও সংকটে থাকা দেশগুলোতে পৌঁছায়।
এর আগে গত বুধবার জাতিসংঘের অন্য একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বছরে ৩০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন। তবে ধনী দেশগুলো এই অর্থ জোগানের প্রতিশ্রুতি পূরণে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।