যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে প্রায় দেড় হাজার শরণার্থী ও অভিবাসীকে ফেরত পাঠিয়েছে মালয়েশিয়া। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তীব্র উদ্বেগ জানানো সত্ত্বেও এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে কুয়ালালামপুর।
আঞ্চলিক সরকারের মন্ত্রী নায় লিন তুন জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া থেকে ছেড়ে আসা ১ হাজার ৪৭৯ জন শরণার্থী ও অভিবাসীকে বহনকারী নৌযানগুলো গতকাল রোববার দিনের শুরুতে ইয়াঙ্গুনের দক্ষিণাঞ্চলে পৌঁছেছে। এর আগে গত মঙ্গলবার নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ এবং একটি চিকিৎসাসংক্রান্ত জাহাজে করে তাঁরা নিজ দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন।
মালয়েশিয়া সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে মোট ৫ হাজার মিয়ানমার নাগরিককে ফেরত পাঠানো হবে। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, দেশটির অভিবাসন হেফাজত কেন্দ্রগুলোতে এখনো ১০ হাজার ৩০০-এর বেশি মিয়ানমারের নাগরিক আটক রয়েছেন।
মালয়েশিয়া সরকারের দাবি, এই নাগরিকরা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরছেন। তবে মানবাধিকারকর্মীদের ভিন্ন মত। তাঁদের মতে, এই শরণার্থী ও অভিবাসীদের সামনে হয়তো আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না, তাই তাঁরা মিয়ানমারে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, বর্তমানে মিয়ানমারে ফেরার পরিস্থিতি মোটেও নিরাপদ নয়।
মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া এই মানুষদের সঙ্গে জান্তা সরকার কেমন আচরণ করবে, সে বিষয়ে আগেভাগে নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মিয়ানমারের নাগরিকদের সঙ্গে তাদের কর্মীদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁরা সত্যিই স্বাধীনভাবে এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য জেনেবুঝে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মিয়ানমারের শরণার্থী ও অভিবাসীদের একটি বড় অংশই হলেন রোহিঙ্গা। তবে এবার ফেরত পাঠানো ১ হাজার ৪৭৯ জনের মধ্যে ঠিক কতজন রোহিঙ্গা রয়েছেন, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় শরণার্থী ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযানে ৫০ হাজারের বেশি শরণার্থী ও অভিবাসী আটক হয়েছেন। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আরও ১০ হাজার ৩০০-এর বেশি মিয়ানমারের নাগরিক বর্তমানে অভিবাসন হেফাজত কেন্দ্রগুলোতে আটক আছেন এবং ধাপে ধাপে মোট ৫ হাজার জনকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম শরণার্থী ও অভিবাসীদের প্রত্যাবাসনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর আগে থেকেই দেশটিতে শরণার্থীদের, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বর্তমানে দ্বিতীয় দফায় আরও ৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি শরণার্থী ও অভিবাসীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মালয়েশিয়া সরকার। মালয়েশিয়া সরকারের ভাষ্যমতে, এই মানুষগুলো দেশটির আর্থিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য নয় মালয়েশিয়া। ফলে দেশটিতে শরণার্থীদের অনিবন্ধিত অভিবাসী হিসেবে গণ্য করা হয়। তা সত্ত্বেও প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয়ের আশায় এই দেশে যান। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় নিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার ৬০০ জন, যার মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি মানুষ রোহিঙ্গা।
গত মাসে মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, দেশে ফিরতে ইচ্ছুক মানুষদের প্রত্যাবাসন হবে ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ’।
মানবাধিকার সংগঠন ফোর্টিফাই রাইটসের জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ইয়াপ লে শেং বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, “মিয়ানমারে ফেরত মানুষদের সঙ্গে জান্তা সরকার কেমন আচরণ করবে, তা আগেভাগে বলার কোনো উপায় নেই।”