হাতে ছেলের ছবি, চোখে অশ্রু আর বুকভরা হাহাকার। বারবার ছবিটি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা। যে ছেলেকে ঘিরে পরিবারের ছিল হাজারো স্বপ্ন, সেই ছেলেই ফিরছেন নিথর দেহে। অন্যদিকে শোকে স্তব্ধ বাবা স্মরণ করছেন ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথন। মৃত্যুর মাত্র এক দিন আগেও মোবাইল ফোনে বাবার খোঁজ নিয়েছিলেন তিতাস। বলেছিলেন, ‘বাবা, তুমি কেমন আছো?’ কে জানত, বাবার সঙ্গে সেটিই হবে তার শেষ কথা!

কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য মো. তিতাস শেখ (২৮)। তার মৃত্যুর খবরে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মা-বাবা, স্ত্রী, স্বজন ও এলাকাবাসীর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহত তিতাস শেখ নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। তার বাবার নাম আফজাল হোসেন। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। তার বুকের বাঁ পাশে গুলি লাগে।

পরে তাকে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে করে রামু সিএমএইচে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে নগরকান্দার বারখাদিয়া এলাকার টুলু শেখের মেয়েকে বিয়ে করেন তিতাস। তাদের দাম্পত্য জীবনে কোনো সন্তান নেই। স্বামীকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার স্ত্রী। অন্যদিকে সন্তান হারানোর বেদনায় দিশাহারা মা-বাবা।

তিতাসের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তার মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার। তিনি বলেন, “ছেলেটির ব্যবহার অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র ছিল। দেশের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবে প্রাণ হারানো অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমি চাই, মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকুক। কোনো সন্ত্রাসী যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি করতে না পারে। দেশ থেকে এসব সন্ত্রাসী নির্মূল করা হোক।”

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “নগরকান্দার একটি পরিবারের সন্তানকে আমরা হারিয়েছি। পরিবারটির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা আমরা কখনো পূরণ করতে পারব না। অন্তত দেশের জন্য যিনি প্রাণ দিয়েছেন, তিনি যেন যথাযথ সম্মান পান, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই আমি এখানে এসেছি।”

তিনি আরও জানান, শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে নিহত তিতাসের মরদেহ নগরকান্দার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পরে সামরিক মর্যাদায় তাকে দাফন করা হবে।