চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকারের অভিপ্রায় অনুসারে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন বাস্তবতা হাজির হয়েছে। সরকারের নিজের মতো করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ, এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে বিরোধী দলের অস্বীকার এবং এ নিয়ে রাজনীতি, সাংবিধানিক রাজনীতির বাইরে থাকা অংশীজনের যুক্ততা, জনমত যাচাইয়ের বিষয়টি কীভাবে হবে এবং সংশোধনের বিষয়টি কতটা টেকসই হবে, এখানে ঝুঁকির বিষয়টি কেমন তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন সিনথিয়া ফরিদ।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে আবারও সংবিধান সংশোধনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে। কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে চায়। বিরোধী দল এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অস্বীকার করেছে।
কমিটি কী সুপারিশ করবে, আমাদের জনপরিসরের বিতর্ক মূলত সেটিকে ঘিরেই চলছে। জুলাই সনদের কোন অংশ টিকে থাকবে? সংসদে কি উচ্চকক্ষ যুক্ত হবে? এর চেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, আমরা উত্তরে পৌঁছাচ্ছি কীভাবে। কারা অংশ নিচ্ছেন, আর শেষ কথা বলছেন কে?
আমাদের সাংবিধানিক ইতিহাসে এর উদ্বেগজনক নজির আছে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বেলায় আমরা সাধারণত ফরমান জারি করি। আলাপ-আলোচনার পথে হাঁটি কম। সেই গণতান্ত্রিক আলোচনার জন্য প্রয়োজন, যাঁরা দ্বিমত পোষণ করেন, তাঁরা এক টেবিলে বসবেন এবং প্রকাশ্যে যুক্তিতর্ক করবেন। বাদ পড়ার কারণে হোক বা স্বেচ্ছায়, তাঁরা অনুপস্থিত থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠ একাই সিদ্ধান্ত নেয়। পরাজিত পক্ষ তখন সেই সিদ্ধান্ত উল্টে দেওয়ার পালার অপেক্ষায় থাকে।
আলোচনার টেবিল থেকে অনুপস্থিত থাকা আমাদের পুরোনো অভ্যাস। প্রধান দুই দলই এ অভ্যাসের অংশীদার। ১৯৯৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী পঞ্চম সংসদ বর্জন করে। ১১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এই বর্জনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। এর ১৭ দিন পর বিরোধী দলের ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। পরে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন।
১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রপতির রেফারেন্সের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ অভিমত দেন যে সংসদ বর্জনও অনুচ্ছেদ ৬৭-এর অধীনে অনুপস্থিতি হিসেবে গণ্য হবে। এই বিধান অনুযায়ী সংসদের অনুমতি ছাড়া টানা ৯০ বৈঠক দিবস অনুপস্থিত থাকলে সদস্যপদ শূন্য হয়।
২০১৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সংসদ বর্জন আমাদের সংসদীয় রাজনীতিতে প্রায় নিয়মিত ঘটনা ছিল। বিরোধী সদস্যরা প্রায়ই সদস্যপদ রক্ষার জন্য শেষ মুহূর্তে সংসদে ফিরতেন। সংসদে যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে মতভেদের মীমাংসা নাগরিকেরা কমই দেখেছেন। মতভেদ বরং রাজপথে নেমেছে। রাজনীতি চরম অবস্থানে আটকে গেছে।
অনির্বাচিত সরকারের হাতে নেওয়া সংস্কারের অভিজ্ঞতাও খুব আলাদা নয়। ২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালায়। আমাদের রাজনীতির এক বিড়ম্বনা হলো, এ ধরনের জবাবদিহির উদ্যোগ সাধারণত রাজনৈতিক সরকারের বাইরে থেকেই এসেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সবচেয়ে স্থায়ী অবদানগুলোর একটি জাতীয় পরিচয়পত্র। এটি ছিল নাগরিকদের প্রত্যাশিত একটি কারিগরি সংস্কার। রাজনৈতিক জীবন নতুন করে গড়ার কাজটি ছিল ভিন্ন। তার জন্য দরকার ছিল সেই দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সমর্থন, যাদের এই সংস্কার টিকিয়ে রাখতে হতো। দলীয় রাজনীতি পুনর্গঠনের সেই প্রচেষ্টা নির্বাচিত সরকার ফিরে আসার পর আর টেকেনি।
২০১০ সালের জুলাইয়ে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি তৃতীয় একটি প্রবণতা দেখায়। এর ১৫ সদস্যের ১২ জনই ছিলেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা। বাকি তিনজন ছিলেন মহাজোটের শরিক দলগুলোর। বিএনপি কোনো সদস্য মনোনয়ন দেয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের মেয়াদ তখন দুই বছরও পূর্ণ হয়নি। সরকারের কর্তৃত্ববাদী রূপ স্পষ্ট হয় আরও পরে। তবু সংসদ বর্জনের পুরোনো ধারা অব্যাহত থাকে।
কমিটি আলাপ-আলোচনা করেছিল ঠিকই। আইনজ্ঞ, সম্পাদকসহ শতাধিক নাগরিকের মত নিয়েছিল। ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ এক সংক্ষিপ্ত আদেশে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। আদালত এ-ও ইঙ্গিত দেন যে পরবর্তী দুটি নির্বাচন এ ব্যবস্থার অধীনে হতে পারে।
২০২৪ সালের হাইকোর্টের একটি রায়ে লিপিবদ্ধ ঘটনাক্রম অনুযায়ী, কমিটি ২৯ মে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার সুপারিশ করে। পরদিন কমিটির সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এক সপ্তাহের মধ্যে কমিটি ব্যবস্থাটি বাতিলের সুপারিশ করে। ৩০ জুন বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছে।
শুধু আদালতের আদেশ দিয়ে এই অবস্থান বদল ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলেরও প্রধান ছিলেন। দল ও নির্বাহী বিভাগ যেখানে একীভূত, সেখানে কমিটির পক্ষে তাঁর অবস্থানের বাইরে যাওয়া কঠিন। শতাধিক নাগরিকের মত নেওয়াও তখন নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।
২০২৪ সালের আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার একটি কমিশনের মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় ৩০টি দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বসে। সেই আলোচনা জরুরি ছিল। তবে সব বিষয়ে দলগুলো একমত হয়নি। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর বিএনপিসহ কয়েকটি দল নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে জুলাই সনদে সই করে।
১১ দিন পর কমিশন প্রস্তাব দেয়, সনদ একটি গণভোটে যাবে এবং অনুমোদিত হলে যেমন আছে তেমনই বাস্তবায়িত হবে। বিএনপি নেতারা প্রতিবাদ জানান যে তাঁদের আপত্তিগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের সহসভাপতি যুক্তি দেন, কোনো দলের ভিন্নমতের চেয়ে জনগণের অনুমোদন অগ্রাধিকার পাবে।
এ যুক্তির জোর আছে। সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। তবে বাস্তবায়নের এই পদ্ধতি নিয়ে দলগুলো একমত ছিল না। একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে অনেকগুলো আলাদা মতভেদের মীমাংসাও হয় না।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গণভোটে পুরো প্যাকেজের পক্ষে স্পষ্ট রায় এসেছে। সেই রায়কে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে মানুষ কোন সংস্কার সমর্থন করেছেন আর কোনটি কেবল মেনে নিয়েছেন, তা বোঝার উপায় নেই। নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং সমঝোতায় পৌঁছানোই রাজনৈতিক দলের কাজ। সমঝোতা টেকসই হয় তখনই, যখন দলগুলো কোন বিষয়ে একমত হলো আর কোথায় আপত্তি রইল, দুটোরই দায় নেয়।
এই অভিজ্ঞতার কিছু ছাপ বর্তমান কমিটিতেও দেখা যায়। সংবিধান সংশোধন কমিটি জুলাই সনদে সই করা দল, আদিবাসী সংসদ সদস্য, অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শ্রমিক ও শিক্ষক এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে একটি আপত্তি থেকে যায়। কমিটির গঠন এখনো নির্বাহী বিভাগনির্ভর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর সভাপতি। আইনমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী এর সদস্য। মন্ত্রীদের নেতৃত্বাধীন কমিটির পক্ষে সরকার ও দলের প্রভাবের বাইরে গিয়ে কাজ করা কঠিন।
দ্য ডেইলি স্টার –এর খবর অনুযায়ী, কমিটির ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা জুলাই সনদের পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারকেও অগ্রাধিকার দিতে চান। নির্বাচনী ইশতেহার থেকে প্রস্তাব আসতেই পারে। তবে সংবিধান সবার জন্য। একটি দলের কর্মসূচি সেখানে চূড়ান্ত মাপকাঠি হয়ে উঠলে সমস্যা তৈরি হয়।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল তাদের জন্য রাখা পাঁচটি আসন প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বরং রাষ্ট্রপতির আদেশে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ চায়। এই পরিষদ গঠিত হবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েই। ভোটাররা গণভোটে পরিষদকে অনুমোদন দিয়েছেন। তবে পরিষদের আইনি ভিত্তির প্রশ্ন এখন হাইকোর্টে বিচারাধীন।
এদিকে বর্জনের ফলে ক্ষমতাসীন দল একাই সংবিধান সংশোধনের সুযোগ পাচ্ছে। বিরোধী দলও ফলাফল প্রত্যাখ্যানের একটি যুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। বিরোধী দল চাইলে কমিটিতে যোগ দিয়েও ফোরামটি নিয়ে নিজেদের আপত্তি জানাতে পারে। পাশাপাশি তারা ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট দিতে পারে। তাহলে তাদের আপত্তি আনুষ্ঠানিক নথিতে থেকে যাবে।
কমিটির প্রক্রিয়াকে আরও গ্রহণযোগ্য করার কয়েকটি উপায় ভেবে দেখা যেতে পারে। মন্ত্রিসভার বাইরের কেউ সভাপতি হলে সংসদের কাছে কমিটির জবাবদিহি আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যদিও সংসদে সংশোধনী নিয়ে ভোটের সময় দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৭০ প্রযোজ্য থাকবে। স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে কমিটি কোন প্রস্তাব পেয়েছে, কোনগুলো গ্রহণ করেছে এবং কেন, তার একটি সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা যেতে পারে।
বিল সংসদে ওঠার আগে খসড়াটি জনমতের জন্য প্রকাশ করা গেলে দলের বাইরের নাগরিকেরাও মত দেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এতে কিছুটা সময় লাগবে। বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদকে প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছিল। সংসদীয় কমিটি সেই সময়সীমায় বাধা নয়। সংবিধান সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে কারণেই এতে যত্ন ও সময় প্রয়োজন। সংবিধান দিবস আমাদের রাজনীতি এবং যে রাষ্ট্রকাঠামো আমরা গড়তে চাই, তা নিয়ে ভাবার উপযুক্ত সময়।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি অবশ্য থেকেই যায়। যাঁরা এখন সাংবিধানিক রাজনীতির বাইরে, তাঁদের কীভাবে আবার এর অংশ করা যাবে? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর, তবে এড়িয়ে যাওয়ার নয়।
আলাপ-আলোচনা কোনো আদর্শবাদী অবস্থান নয়। এটি একটি চর্চা, যা দলগুলোকে শিখতে হয়। নিয়মিত আলাপ-আলোচনা রাজনৈতিক অবস্থানকে ভিন্ন যুক্তির মুখোমুখি করে। সব দল এ ধরনের আলোচনায় নিয়মিত অংশ নিলে দল ও রাষ্ট্রের একীভূত অবস্থাও ধীরে ধীরে শিথিল হতে পারে। ভিন্নমতের মানুষেরা অংশ নেওয়ার প্রকৃত সুযোগ পেয়েছেন কি না, সেটি গণতন্ত্রের আসল মাপকাঠি। কমিটি তাঁদের আপত্তির জবাব দিলে এবং ভিন্নমত লিপিবদ্ধ করলে প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বাড়বে। তাঁরা ফলাফলের সঙ্গে একমত না-ও হতে পারেন। তবু প্রক্রিয়াটি ন্যায্য ছিল, এটুকু মানতে পারলে সংশোধন টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, একতরফা সংশোধন পরের সরকারের হাতে আবার বদলে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
ড. সিনথিয়া ফরিদ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়ার রিসার্চ ফেলো।
মতামত লেখকের নিজস্ব