জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি, তবে এরই মধ্যে বিএনপির সংসদীয় দলের একটি জরুরি সভা ডেকেছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামীকাল রোববার সন্ধ্যা ছয়টায় জাতীয় সংসদের সরকারি দলের সভাকক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
সাধারণত সংসদের অধিবেশন শুরুর দুই-এক দিন আগে অথবা অধিবেশন চলাকালীন সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে এবার অধিবেশনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এই সভা ডাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংসদের অধিবেশন শুরু হতে পারে।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার মতে, নিয়মিত বৈঠকের বাইরে এই আকস্মিক সভার পেছনে কিছু বিশেষ কারণ রয়েছে। সংসদ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দলের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ডেকেছেন, তিনি নিশ্চয়ই কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বিষয়ে ইনস্ট্রাকশন (নির্দেশনা) দেবেন।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার বিষয়ে এই সভায় বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দলের কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সংবিধান সংশোধন এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও দিকনির্দেশনা আসতে পারে।
বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নেতা-কর্মীদের অপরাধে জড়ানোর বিষয়টি একটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো রাজধানীর মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ (মিষ্টি) পদত্যাগ করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। এছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ তিনটি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জন নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারই বার্তা দিচ্ছে বিএনপি।
অন্যদিকে, সংবিধান সংশোধনের বিষয়টিও সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটি বর্তমানে কাজ করছে। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ২০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দল এবং সংবিধানবিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন, বিরোধী দলের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা অত্যন্ত জরুরি। সংসদীয় দলের এই বৈঠকে এ বিষয়ে দলের অবস্থান এবং সংসদ সদস্যদের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য একটি বড় সাংগঠনিক পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের প্রত্যাশা ও ক্ষোভ সামলানো, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করা দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের সময়সূচি ও প্রস্তুতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা তৃণমূলের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পাশাপাশি ক্ষমতায় আসার পর সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা বিএনপির জন্য এখন সময়ের দাবি। কমিটি পুনর্গঠন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত এবং নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোও এই আলোচনায় আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।