রাজনৈতিক পরিস্থিতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, অচিরেই ‘স্বৈরাচার’ ও ‘গুপ্ত’রা একজোট হতে পারে। এই সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় দলের সংসদ সদস্যদের একতাবদ্ধ থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সাথে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করে এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করার আহ্বান জানান তিনি। তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল, স্থানীয় পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

আজ রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের এক বিশেষ সভায় এসব নির্দেশনা প্রদান করেন তারেক রহমান। সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র মুক্তকণ্ঠকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে শুরু হওয়া এই সভা তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে এবং রাত সাড়ে নয়টার দিকে শেষ হয়। সভায় বিএনপির ১৯৪ জন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সভায় অন্তত ২৫ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাঁদের বক্তব্য পেশ করেন।

সভাপতির বক্তব্যে তারেক রহমান গণতান্ত্রিক চর্চাকে অব্যাহত রেখে ইতিবাচক ও পরিবর্তনশীল রাজনীতি করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “বিএনপি হামলা-মামলা, জেল-জুলুমের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।” জনগণের প্রত্যাশা ও চাহিদার সাথে সংগতি রেখে দলকে ইতিবাচক ও পরিবর্তনশীল রাজনীতির পথে এগিয়ে নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, সরকারকে অনেক বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে রীতিমতো মব সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই ধরনের বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংসদ সদস্যদের প্রস্তুত থাকার কথা বলেন তিনি। এছাড়া দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধের পাশাপাশি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “এবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। অতীতে হয়তো তাঁরা অন্য একটি দলকে ভোট দিতেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালনের পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।”

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে। তাই এখন থেকেই নিজ নিজ এলাকায় কাজ শুরু করতে হবে। এই নির্বাচন সরকারের জন্যও বিশেষ পরীক্ষা। স্থানীয় পর্যায়ে যেখানে যিনি জনপ্রিয়, তাঁকে প্রার্থী করতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দল-সমর্থিত প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে তাঁদের পাশে রাখতে হবে। কোনোভাবেই সংগঠনকে দুর্বল হতে দেওয়া যাবে না।

কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করে রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়নের তাগিদ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, “গোপালগঞ্জের রাজনীতি এক রকম, বগুড়ার রাজনীতি আরেক রকম।” তাই এলাকার চাহিদা অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে কর্মসূচি নিতে হবে। আগামী ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচিও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পালনের পরামর্শ দেন তিনি।

সভায় বক্তব্য প্রদানকারী সংসদ সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়া, মাদকের বিস্তার এবং মাদক কারবারিরা গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তাঁরা সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম এবং ফ্যাসিবাদের দোসরদেরও ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করেন।

এ সময় একজন সংসদ সদস্য অন্যের নির্বাচনী এলাকায় হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান। অন্য একজন প্রতিমন্ত্রী চাকরিবাকরিসহ সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করেন।

সভায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন। সভামঞ্চে সংসদ নেতা ও বিএনপির চেয়ারম্যানের এক পাশে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম এবং অন্য পাশে আবদুল মঈন খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আসন গ্রহণ করেন।