গ্রামের রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যুতের খুঁটি, আর সেই খুঁটি থেকে ঝুলে আছে তার। বসতবাড়ি, বাজারের দোকানপাট, স্থানীয় স্কুল ও মসজিদে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আগেই সম্পন্ন করা হয়েছে ওয়্যারিং। এমনকি অনেক বাড়ি ও দোকানে বসানো হয়েছে মিটারও। তবে দীর্ঘ আট বছর পার হয়ে গেলেও এই খুঁটিগুলো দিয়ে সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায়নি বিদ্যুৎ।

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বেশ কিছু গ্রামের বাসিন্দারা আট থেকে নয় বছর ধরে এমন চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হয়নি। এর ফলে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার মৌলিক এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সম্প্রতি জেলা শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সুবর্ণচরের মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চর নোমান, চর আক্রাম উদ্দিন, চরলক্ষ্মী ও চর উরিয়া গ্রামের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, রাস্তার পাশে সারি সারি বিদ্যুতের খুঁটি ও তারের জাল বিছানো। অনেক দোকানে মিটার বসানো থাকলেও বিদ্যুৎ নেই। কোথাও কোথাও মিটারের সঙ্গে সার্ভিস তার যুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু সংযোগহীন। দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত পড়ে থাকায় অনেক জায়গায় মিটার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে জং ধরেছে এবং পুরু ধুলোর আস্তরণ জমেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের দিকে এই এলাকাগুলোতে বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপন ও লাইন টানার কাজ শুরু হয়েছিল। এরপর অনেক পরিবার নিজেদের ঘরে ওয়্যারিং করিয়ে মিটার সংগ্রহ করে। বিদ্যুৎ আসবে এই আশায় অনেকে বৈদ্যুতিক পাখা, ফ্রিজ ও টেলিভিশনও কিনেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বিদ্যুৎ না আসায় এসব দামি সরঞ্জাম এখন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

চর নোমানের করিম মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. ইউছুফ বলেন, “২০১৮ সালের দিকে তিনি তার দোকানে বিদ্যুতের ওয়্যারিং করান। মিটার বসানোর পাশাপাশি খুঁটি থেকে সার্ভিস তারও টানা হয়। বিদ্যুৎ আসবে, এমন আশায় ফ্রিজ ও টেলিভিশন কিনেছিলেন। কিন্তু এখনো বিদ্যুৎ পাননি। এতে কেনা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, “এক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হবে বলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল আট বছর পার হলেও বিদ্যুৎ পাননি। দোকানে থাকা সরঞ্জামগুলো এখন অব্যবহৃত। পরে নিরুপায় হয়ে কিস্তিতে সোলার প্যানেল বসিয়ে দৈনন্দিন কাজ চালাচ্ছেন তিনি।”

স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা আবদুল মান্নান জানান, শুধু বসতবাড়ি কিংবা বাজার নয়, গ্রামের স্কুল, মসজিদ ও মাদ্রাসায়ও বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য ওয়্যারিং করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। ফলে বিদ্যুতের খুঁটি ও তার দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে আছে। কোথাও তারে আগাছা জড়িয়ে গেছে, কোথাও খুঁটির সঙ্গে তার স্তূপ করে বেঁধে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো বাড়িতে মিটার ও তারে মাকড়সার জালও দেখা যায়।

মোহাম্মদপুর ও চরক্লার্ক এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষিকাজেও ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকেরা। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও অনেকে সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক কৃষক সবজি উৎপাদন করতে পারছেন না।

৯ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় কৃষক আবদুর রব মুন্সী বলেন, “বিগত সরকারের শতভাগ বিদ্যুতায়নের প্রতিশ্রুতির আশায় আট বছর ধরে বিদ্যুতের খুঁটি ও লাইন পড়ে আছে। পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করলেও বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হয়নি। মিটারগুলোতে মরিচা ধরছে, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকেরা।”

তিনি আরও বলেন, “তার মতো আশপাশের অনেক কৃষকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাবে সবজি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সবজি উৎপাদনের খরচ দ্বিগুণ হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে অনেকে কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন।”

চরক্লার্ক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওমর ফারুক বলেন, “সোলার থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ দিয়ে সব কাজ করা যায় না। প্রয়োজনীয় কাজ করতে তাকে তিন কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। বিদ্যুতের খুঁটি ও তার স্থাপন, বাড়ি ও দোকানে ওয়্যারিং এবং মিটার বসানোর পরও কেন বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো তৈরি করার পরও হাজারো পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”

মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. জিয়া বলেন, “আমাদের ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অনেক এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ও লাইন স্থাপন করা হয়েছে। মানুষের ঘরে ঘরে ওয়্যারিং ও মিটারও বসানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ আট বছরেও বিদ্যুৎ সংযোগ চালু হয়নি। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধান করে এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মকবুল আলম বলেন, “আট বছর আগের ওই প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না।” তবে তিনি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করতে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”