কুষ্টিয়া জেলায় তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে স্থবির হয়ে পড়েছে কলকারখানার চাকা। ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন এবং নষ্ট হচ্ছে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা। এর ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

তদন্ত করে জানা গেছে, জেলার অধিকাংশ এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ এলেও তা স্থায়ী হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট। শহর থেকে গ্রাম, আবাসিক এলাকা থেকে শিল্পাঞ্চল—সবখানেই অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহে বাড়ছে ভোগান্তি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উৎপাদন খাত।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি রয়েছে। শহর ও শহরতলিতে চাহিদা ৬২ থেকে ৬৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৪০ থেকে ৪২ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এলাকায় সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠলেও গড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ১ সেপ্টেম্বরের তথ্যানুসারে কুষ্টিয়ায় ২২ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের রেকর্ড পাওয়া গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। দিন-রাত দফায় দফায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ফ্যান, ফ্রিজ, পানির মোটর এবং অনলাইনভিত্তিক কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা ওসমান বলেন, "বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর কখন আসবে তার ঠিক নেই। আবার এলেও কিছুক্ষণ পর চলে যায়। গরমের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে।"

আরেক বাসিন্দা মিরাজুল জানান, "বাসার বিদ্যুৎ দিয়ে শুধু আলো বা ফ্যান চলে না। ফ্রিজ, পানির মোটর, অনলাইন কাজ, পড়াশোনা—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। বারবার বিদ্যুৎ গেলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই ব্যাহত হয়।"

দেশের সর্ববৃহৎ সরু চালের মোকাম খাজানগরে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। রাইস মিলগুলো না চলায় ধানের ট্রাক আনলোড করা যাচ্ছে না এবং শ্রমিকরা বেকার হয়ে বসে আছেন। স্বর্ণা অটোরাইস মিলের মালিক আব্দুস সালাম বলেন, "শ্রমিকদের কাজ দিতে পারছি না। তাদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বাড়ছে কয়েক গুণ।"

মিল মালিকদের দাবি, আগে প্রতিদিন ৯০ টন চাল উৎপাদন হলেও বর্তমানে জেনারেটর চালিয়েও তা ৩০ টনের বেশি হচ্ছে না। গোল্ডেন রাইস মিলের মালিক জিহাদুজ্জামান জিকু বলেন, "বিদ্যুৎ চলে গেলে মেশিনের ভেতরের ধান আটকে যায়। এতে ধান ও চালের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।" তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ কমেছে।

কৃষি ও মৎস্য খাতেও দেখা দিয়েছে সংকট। সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কৃষকদের। কুমারখালীর কৃষক তৈয়ব শেখ বলেন, "সেচের সময় বিদ্যুৎ না থাকলে সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যায় না। বিদ্যুৎ কখন আসবে, তারও ঠিক নেই। বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত পাম্প চালাতে হচ্ছে। এতে খরচ বাড়ছে।"

মৎস্যচাষিদের উদ্বেগ যে, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে এয়ারেটর বন্ধ হয়ে মাছের অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। মৎস্যচাষি কানন বলেন, "লোডশেডিংয়ের কারণে মাছ চাষ নিয়ে ঝুঁকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক মাছ চাষ আমরা বিদ্যুতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অক্সিজেন সরবরাহ থেকে শুরু করে পাম্প ব্যবহারে লোডশেডিংয়ের কারণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।"

শহরের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, মুরগির খামারি এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকরাও এই সংকটে দিশেহারা। অটোরিকশাচালক তুজাম বলেন, "অটোর ব্যাটারি চার্জ দিতে বিদ্যুৎ দরকার। দীর্ঘ সময় লোডশেডিং থাকলে সময়মতো চার্জ দিতে পারি না। ফলে গাড়ি চালানোর সময় কমে যায় এবং আয়ও কমে যায়।"

ওজোপাডিকোর তথ্য অনুযায়ী, শহর ও শহরতলির ৮২ হাজার গ্রাহকের জন্য ২০ মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় থাকা ৬ লাখ ৬ হাজার গ্রাহক চাহিদার তুলনায় ২০-২৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনমনে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের কথা উল্লেখ করে ওজোপাডিকো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে। সচেতন নাগরিক শাহারিয়া ইমন রুবেল বলেন, "বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি থাকলে সাময়িক লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন হতে পারে, এটি আমরা বুঝি। তবে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং ঘন ঘন আসা-যাওয়ার কারণে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।"

কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার ইসমাত কামাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বিদ্যুতের চাহিদা মূলত সিজনভিত্তিক ওঠানামা করে। এখানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত থাকে। চাহিদার তুলনায় এভারেজে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।"

ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী আমজাদ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। সমানুপাতের হারে শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক অঞ্চল অনুযায়ী আমরা সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং দিচ্ছি।"