জাতীয় দলের জার্সিতে খেলতে গিয়ে চোট পাওয়ার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা এখনো মনে গেঁথে আছে রাফিনিয়ার। যদিও সেই চোট কাটিয়ে তিনি পুনরায় মাঠে ফিরেছেন, তবে বার্সেলোনার এই ব্রাজিলিয়ান তারকা এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই নভেম্বরে দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের জন্য তাকে দলে ডেকেছেন ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। এই ডাক নিয়ে বার্সেলোনা শিবিরের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও সমর্থকদের আশ্বস্ত করেছেন রাফিনিয়া। তিনি জানিয়েছেন, নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং মাঠে খেলার সময়সীমা নিয়ে ইতোমধ্যে আনচেলত্তির সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি এখনো শতভাগ ফিট নন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বার্সেলোনার সঙ্গে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের পর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন রাফিনিয়া। ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড স্প্যানিশ ক্লাবটির সঙ্গে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত তার চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করেছেন। তবে নতুন চুক্তির এই আনন্দের মুহূর্তের মাঝেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে তার শারীরিক সুস্থতা এবং আসন্ন আন্তর্জাতিক বিরতিতে ব্রাজিলের হয়ে মাঠে নামার বিষয়টি।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মুন্দো দেপোর্তিভোর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলের হয়ে পুনরায় মাঠে নামার আগে নিজের খেলার সময় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আনচেলত্তির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন রাফিনিয়া। নতুন করে চোট পাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে ইতালিয়ান কোচ তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নেবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
এ প্রসঙ্গে রাফিনিয়া বলেন, ‘কোচ হিসেবে আনচেলত্তি জানেন, খেলোয়াড়দের খেলার সময় কীভাবে ভাগ করে দিতে হয়। তিনি এটাও বোঝেন, নতুন করে চোট পাওয়া ব্রাজিলের জন্যও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করবে। খেলার সময় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সেটিও তিনি জানেন।’
এরপর বার্সেলোনা অধিনায়ক নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কথা হয়েছে। তিনি জানেন, আমি এখনো চোট থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় আছি। আমি ভালো আছি, কিন্তু শতভাগ ফিট নই। বার্সেলোনার সমর্থকদের দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। শারীরিকভাবে ভালো থাকতে আমি সব সময় সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।’
মূলত গত ২৯ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্রাজিলের একটি প্রীতি ম্যাচে খেলার সময় ডান ঊরুর পেছনের পেশিতে সমস্যার সম্মুখীন হন রাফিনিয়া। ওই ম্যাচে ব্রাজিল অস্ট্রেলিয়াকে ৪-২ গোলে পরাজিত করলেও বিরতির সময়ই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল এই ফরোয়ার্ডকে।
পরদিন ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন থেকে জানানো হয়, পরীক্ষায় রাফিনিয়ার ডান ঊরুর পেশিতে সামান্য ফোলা বা মাসল এডিমা ধরা পড়েছে। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে তাকে জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। যার ফলে ভারতের বিপক্ষে পরবর্তী প্রীতি ম্যাচেও তিনি অংশ নিতে পারেননি।
এরপর বার্সেলোনায় ফিরে দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান রাফিনিয়া। ক্লাব ফুটবলে তিনি ফিরে এলেও তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক রয়েছে কাতালান ক্লাবটি।
এমন এক সময়ে আবারও জাতীয় দলের ডাক পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বার্সেলোনা কোচ হান্সি ফ্লিক। বিশেষ করে নভেম্বরে ব্রাজিলের সিঙ্গাপুর সফরের দীর্ঘ বিমানযাত্রা এবং খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি ম্যাচ খেলার চাপ নিয়ে তিনি চিন্তিত।
গত ৩০ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্লিক জানান, রাফিনিয়ার জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি ক্লাবের ক্রীড়া পরিচালক ডেকোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। জার্মান এই কোচের ভাষায়, ‘আগের আন্তর্জাতিক বিরতি থেকে সে চোট নিয়ে ফিরেছিল। পরিস্থিতিটা আদর্শ নয়। তবে এটাই বাস্তবতা, আমাদের কিছু করার নেই।’
তবে রাফিনিয়ার জাতীয় দলের প্রতি যে গভীর দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা স্বীকার করেছেন ফ্লিক। তার মতে, ব্রাজিলের হয়ে খেলা যেকোনো ফুটবলারের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর রাফিনিয়ার সফরে যাওয়া নিয়ে আপত্তি জানানোর সুযোগ নেই বার্সেলোনার।
ফ্লিক আশা প্রকাশ করেন যে, ব্রাজিলের কোচিং স্টাফরা রাফিনিয়ার খেলার সময় সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করবেন। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি এবং সাম্প্রতিক চোটের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও প্রত্যাশা তার।
তবে রাফিনিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই উদ্বেগের কিছুটা প্রশমন হয়েছে। কারণ, তিনি সরাসরি ব্রাজিল কোচের সঙ্গে নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। যদিও তিনি কত মিনিট খেলবেন কিংবা কোনো ম্যাচে বিশ্রাম পাবেন কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানাননি এই বার্সেলোনা অধিনায়ক।
নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতিতে সিঙ্গাপুরে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে ব্রাজিল। আগামী ১৪ নভেম্বর জাপানের মুখোমুখি হবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এরপর ১৭ নভেম্বর স্বাগতিক সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে মাঠে নামবে আনচেলত্তির দল। দুটি ম্যাচই সিঙ্গাপুরের জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে চলতি মৌসুমে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন রাফিনিয়া। বার্সেলোনার হয়ে ২০২৬-২৭ মৌসুমে প্রথম ১৩ ম্যাচেই ১৯টি গোল করেছেন তিনি। এর মধ্যে লা লিগায় ১৫টি এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চারটি গোল। স্প্যানিশ লিগের বর্তমান সর্বোচ্চ গোলদাতাও এই ব্রাজিলিয়ান তারকা।
মূলত উইঙ্গার হিসেবে পরিচিত হলেও চলতি মৌসুমে আক্রমণভাগের মাঝখানেও নিয়মিত খেলছেন রাফিনিয়া। নতুন এই ভূমিকায় নিজেকে মানিয়ে নিয়ে তিনি বার্সেলোনার আক্রমণে আরও অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন।
তার এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাঝেই বৃহস্পতিবার নতুন চুক্তির ঘোষণা দেয় বার্সেলোনা। ক্লাব সভাপতি হোয়ান লাপোর্তার উপস্থিতিতে দুই বছরের চুক্তি নবায়ন করেন রাফিনিয়া। ফলে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কাতালান ক্লাবটির সঙ্গে তার সম্পর্ক নিশ্চিত হলো।
২০২২ সালে ইংলিশ ক্লাব লিডস ইউনাইটেড থেকে বার্সেলোনায় যোগ দিয়েছিলেন রাফিনিয়া। এরপর থেকে ক্লাবটির হয়ে ১৯০ ম্যাচে ৯৪ গোল করেছেন তিনি। এছাড়া জিতেছেন তিনটি লা লিগা, একটি কোপা দেল রে এবং তিনটি স্প্যানিশ সুপার কাপ।
নতুন চুক্তি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে রাফিনিয়া জানান, বার্সেলোনার হয়ে ব্যক্তিগত ও দলীয় পর্যায়ে যা অর্জন করেছেন, তা নিয়ে তিনি গর্বিত। শারীরিক সামর্থ্য অনুমতি দিলে এই ক্লাবেই তার ক্যারিয়ার শেষ করার ইচ্ছা রয়েছে।