ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে খেলতে গিয়ে রাফিনিয়ার চোট পাওয়ার ইতিহাস বার্সেলোনার জন্য মোটেও সুখকর নয়। সেই পুরোনো দুঃস্বপ্ন আবারও ফিরে আসবে কি না, তা নিয়েই এখন চিন্তিত কাতালান ক্লাবটি।

নভেম্বরের ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতিতে দুটি প্রীতি ম্যাচের জন্য রাফিনিয়াকে দলে ডেকেছেন ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। আর এই সিদ্ধান্তই বার্সেলোনা কোচ হান্সি ফ্লিককে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। কারণ, এবার জাতীয় দলের হয়ে খেলতে রাফিনিয়াকে প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘স্পোর্ত’-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

আগামী ১৪ নভেম্বর জাপানের বিপক্ষে এবং ১৭ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবে ব্রাজিল। দুটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে সিঙ্গাপুর জাতীয় স্টেডিয়ামে। এত দীর্ঘ ভ্রমণের শারীরিক ধকল রাফিনিয়া কতটা সহ্য করতে পারবেন, সেটাই এখন ফ্লিকের প্রধান উদ্বেগের কারণ।

লা লিগায় আলাভেসের বিপক্ষে ম্যাচের আগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোচ হান্সি ফ্লিক তাঁর এই দুশ্চিন্তার কথা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “গত আন্তর্জাতিক বিরতির পর সে চোট নিয়ে ফিরেছিল। মোটেও সেটা ভালো পরিস্থিতি ছিল না। এ নিয়ে আমাদের করার কিছু নেই...সিঙ্গাপুরে আসা-যাওয়াটা আদর্শ কোনো বিষয় নয়। তবে এটা এমন কিছু নয় যা আমার হাতে আছে বা আমি বদলাতে পারব।”

চলতি মৌসুমে ১১ ম্যাচে ১৫টি গোল করা রাফিনিয়াকে নিয়ে ফ্লিকের উদ্বেগের পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপের সমাপ্তির পর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের আন্তর্জাতিক বিরতিতে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে প্রীতি ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, ওই দুটি ম্যাচ খেলতে রাফিনিয়াকে প্রায় ৩৫ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করতে হতো। তবে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলার সময় উরুতে চোট পাওয়ায় তিনি ভারতে আর যাননি এবং সরাসরি স্পেন ফিরে আসেন।

সেই চোটের প্রভাবে লা লিগায় হেতাফে এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে খেলতে পারেননি তিনি। পরবর্তীতে মাঠে ফিরে গোল পাওয়া গেলেও, মৌসুমের শুরুর সেই বিধ্বংসী ফর্মে এখনও পুরোপুরি ফিরতে পারেননি বার্সা অধিনায়ক।

শুধু এবারই নয়, গত মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক বিরতিতে ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলার সময় হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়েছিলেন রাফিনিয়া। পাঁচ সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকায় বার্সেলোনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। এরপর বিশ্বকাপে হাইতির বিপক্ষে ম্যাচেও তিনি চোট পান, যার ফলে বিশ্বকাপের বাকি অংশে ব্রাজিল তাঁকে পায়নি। বার্সেলোনাকেও তাঁকে সুস্থ করে তুলতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে।

এমন অভিজ্ঞতার পর বার্সেলোনার এই আশঙ্কা অমূলক নয়। তবে এবারের ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে কার্লো আনচেলত্তির একটি সিদ্ধান্ত। নভেম্বরের প্রীতি ম্যাচের স্কোয়াডে ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবল ক্লাব পালমেইরাস ও ফ্ল্যামেঙ্গোর কোনো খেলোয়াড়কে রাখেননি তিনি। কারণ, ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় ওই দুই ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ রয়েছে।

এমতাবস্থায় বার্সেলোনার ক্ষেত্রে একই বিবেচনা করা হলো না কেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্সার সমর্থকরা এই প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে যখন ম্যাচ দুটি নিছক প্রীতি ম্যাচ এবং কোনো প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টের অংশ নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দল ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি নিজেই জানিয়েছেন যে, বর্তমানে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালালেও ছয়জন খেলোয়াড় তাঁর দলের ‘মেরুদণ্ড’। রাফিনিয়া সেই ছয়জনের একজন।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এত গুরুত্বপূর্ণ একজন ফুটবলারকে এই দুটি প্রীতি ম্যাচে বিশ্রাম দেওয়া সম্ভব ছিল না কেন? স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, স্কোয়াড ঘোষণার অনেক আগেই ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) কাছে রাফিনিয়াকে এবার দলের বাইরে রাখার অনুরোধ জানিয়েছিল বার্সেলোনা। কিন্তু আনচেলত্তি সেই অনুরোধ গ্রহণ করেননি।

বরং দল ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর চাপ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ প্রথমে কিছুটা কূটনৈতিক উত্তর দেন। তিনি বলেন, “ব্রাজিলিয়ান এবং ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর সাথে আমাদের সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে এবং খেলোয়াড়দের বিষয়ে আমরা তাদের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করে থাকি। সাধারণভাবে এই সম্পর্কটা বেশ ভালোই।”

তবে এর পরপরই তাঁর সুর বদলে যায়। আনচেলত্তি স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের কাছে কোনো বিশেষ অনুরোধ আসেনি, আমাদের সেটির প্রয়োজনও নেই। আন্তর্জাতিক বিরতিতে আমরা এমন খেলোয়াড়দেরই দলে ডাকব, যাদের আমরা ব্রাজিল জাতীয় দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।”

ব্রাজিল কোচের এই কথা থেকে স্পষ্ট যে, রাফিনিয়াকে ছাড় দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে হান্সি ফ্লিক এখনও আশাবাদী। আনচেলত্তির কাছে তাঁর একটি ছোট অনুরোধ, “ব্যক্তিগতভাবে, তার খেলার সময় যদি কিছুটা কমানো যায়, আমি খুশি হব।”

আনচেলত্তি শেষ পর্যন্ত এই অনুরোধ রাখবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে।