২৩ বছরের দীর্ঘ পথচলা, যেখানে মিশে আছে আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির এক দীর্ঘ ইতিহাস। সবকিছুর সমাপ্তি কি তবে মাত্র পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিওতে? পরনে বোতাম লাগানো অফ হোয়াইট রঙের টি-শার্ট, হাতে কিছু কাগজ নিয়ে সোফায় বসেছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কী বলবেন, তা আগে থেকেই লিখে নিয়েছিলেন ওই কাগজে। এরপর তিনি যা পড়ে শোনালেন, তার মূল কথা ছিল একটিই—পর্তুগালের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তাঁকে আর দেখা যাবে না।

বাংলাদেশ সময় গতকাল বিকেল ৪টা ২১ মিনিটে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। সেখানে পর্তুগালের প্রতি তাঁর গভীর আবেগের কথা উঠে এসেছে। সেরা হওয়ার যে তাড়না রোনালদোর ‘ডিএনএ’-তে মিশে আছে, সেই কথাগুলোও তিনি উল্লেখ করেন। ভিডিওতে রোনালদো যখন কথাগুলো বলছিলেন, তাঁর মুখে মাঝে মাঝে মৃদু হাসি ফুটে উঠছিল। তাঁর এই আবেগঘন কথাগুলো ভক্তদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে।

ফুটবল ক্যারিয়ারে রোনালদোকে অনেকবার কাঁদতে দেখা গেছে। ২০০৪ সালে ইউরো ফাইনালে গ্রিসের কাছে পরাজয়ের পর কিশোর রোনালদোর সেই কান্নার কথা মনে পড়ে। পরিণত বয়সে এসেও তিনি কম কেঁদেছেন বলে মনে হবে না। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর টানেলের ভেতর দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। এছাড়া গত বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে পরাজয়ের পরও তাঁর চোখে জল এসেছিল।

তবে সব কান্নাই কি দুঃখের ছিল? আনন্দের কান্নাও ছিল তাঁর জীবনে। ২০১৬ সালের ইউরো কাপ জয় ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সাফল্য। সেই টুর্নামেন্টের ২৫ মিনিটেই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। ডাগআউটে বসে তিনি যেন কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের ‘ছায়া কোচ’ হয়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পর্তুগাল যখন চ্যাম্পিয়ন হলো, তখন নিজেকে সামলাতে পারেননি রোনালদো। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতি টানার ঘোষণা দেওয়ার সময় তিনি তাঁর আবেগ খুব দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। রোনালদো কাঁদেননি ঠিকই, তবে তাঁর বিদায়বার্তা শুনে কোটি কোটি ভক্তের চোখ ভিজে উঠেছে।

এই দীর্ঘ সম্পর্কের মূলে ছিল গভীর আবেগ। রোনালদোর বিদায়ী ভাষণেও সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বারবার। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে সুন্দর অংশটি ছিল—‘গোলের স্মৃতি একসময় ফিকে হয়ে যায়, ট্রফি জাদুঘরে জায়গা পায়, রেকর্ডও একদিন ভেঙে যায়; কিন্তু এমন একটি বিষয় আছে, যা সময় কখনো মুছে দিতে পারে না—মানুষের হৃদয়ে আমাদের স্থান।’

২০০৩ সালের ২০ আগস্ট কাজাখস্তানের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর অভিষেক হয়। সেদিন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন ১৬ নম্বর জার্সি গায়ে। এরপর কিছুদিন ১৭ নম্বর জার্সিও পরেন তিনি। কারণ তখন পর্তুগাল দলে লুইস ফিগোর মতো বিখ্যাত এক ‘সেভেন’ ছিলেন। ২০০৭ সালে ফিগোর অবসরের পর ৭ নম্বর জার্সিটি রোনালদোর অধিকারে আসে। এরপর সেই সংখ্যাটি কেবল একটি জার্সির সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড—CR7। শুধু জার্সি নয়, তাঁর ‘সিউউউ’ উদ্‌যাপনও ফুটবল বিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য খেলা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড তাঁর দখলে। ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকা দীর্ঘ হলেও দলীয় সাফল্যের কথা বললে মহাদেশীয় পর্যায়ে একটি ইউরো কাপ এবং দুটি ইউরোপিয়ান নেশনস লিগ জয়ের কথা আসে। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ বিশ্বকাপ জয় না করা। তিনি কখনোই বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে পারেননি; ২০০৬ সালের সেমিফাইনালই ছিল পর্তুগালের সর্বোচ্চ দৌড়। অনেকের মতে, রোনালদোর সেরা সময়ে পর্তুগাল বিশ্বকাপ জেতার মতো শক্তিশালী দল ছিল না। আবার যখন পর্তুগাল দাবিদার হয়ে উঠল, তখন রোনালদো ছিলেন তাঁর সেরা সময়ের চেয়ে কিছুটা দূরে। ২০২২ বিশ্বকাপের সুইজারল্যান্ড ম্যাচটি ছিল তাঁর শেষের শুরু। লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই পরিবেশ ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। গ্যালারিতে সারি সারি ৭ নম্বর জার্সি, রোনালদোর কাটআউট আর মুখোশ পরা সমর্থকদের ভিড়। অথচ রোনালদো তখন বসে ছিলেন বেঞ্চে। দর্শকদের নজর মাঠের খেলার চেয়ে বেশি ছিল ডাগআউটের রোনালদোর দিকে। ফুটবল ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল।

কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল দীর্ঘ। শেষটা এসে দাঁড়াল বর্তমান কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে দ্বন্দ্বে। একাদশে জায়গা না পাওয়ায় তিনি দল ছেড়ে চলে যান। গত সেপ্টেম্বরে ইউরোপিয়ান নেশনস লিগের সেই ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন পর্তুগাল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। পরে ১৭৪০ শব্দের এক দীর্ঘ বিবৃতির মাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি পুনরায় আলোচনায় আসেন। বয়স ৪০ হয়ে গেলেও তাঁর অদম্য জেদ আর নিজেকে প্রমাণ করার তাড়না তাঁকে থামিয়ে রাখতে দেয়নি। তিনি চেয়েছিলেন নিজের মতো করে শেষ করতে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত চরম সত্যটি মেনে নিতে হয়েছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও।

ফুটবল বিশ্বে এখন এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে। লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল ছেড়েছেন দুই মাসের কিছু বেশি সময় আগে, আর এখন তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীও বিদায় নিলেন। এই দুই মহাতারকার দ্বৈরথই গত দুই দশকের ফুটবলকে রঙিন করে তুলেছিল। তবে বিদায় মানেই সব শেষ নয়। রোনালদোর কথা অনুযায়ী, তাঁদের জন্য একটি চিরস্থায়ী আসন সংরক্ষিত থাকবে—মানুষের মনে!