দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্তুগালের জাতীয় দলের জার্সিতে একের পর এক ইতিহাস রচনা করেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। গোল উৎসব, শিরোপা জয় এবং অসংখ্য রেকর্ড ভেঙে তিনি ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন। এবার সেই দীর্ঘ ও গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি টানতে যাচ্ছেন এই পর্তুগিজ মহাতারকা।

৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড জানিয়েছেন, নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পর তিনি জাতীয় দল থেকে অবসর নেবেন। এখন পর্যন্ত পর্তুগালের হয়ে ২৩৪টি ম্যাচে ১৪৬টি গোল করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক পুরুষ ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলের যে দুটি বিশ্বরেকর্ড রয়েছে, তার দুটিই বর্তমানে রোনালদোর দখলে। তবে কেবল এই দুটি নয়, বিশ্বকাপ, ইউরো এবং বাছাইপর্ব মিলিয়ে আরও অনেক অনন্য কীর্তি গড়েছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই ফুটবলার।

গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সিদ্ধান্ত জানান রোনালদো। দীর্ঘ ২৩ বছরের ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না বলে উল্লেখ করেন তিনি। আগামী আন্তর্জাতিক বিরতির পর পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী সাত নম্বর জার্সিটি পরবর্তী প্রজন্মের কোনো ফুটবলারের হাতে তুলে দিতে চান এই তারকা।

রোনালদোর জাতীয় দলের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালের ২০ আগস্ট, যখন কাজাখস্তানের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে তিনি অভিষেক করেন। তার ঠিক পরের বছর ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে গ্রিসের বিপক্ষে করেন ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সময়ের সাথে সাথে যেমন তার গোলের সংখ্যা বেড়েছে, তেমনি সমৃদ্ধ হয়েছে তার রেকর্ডের খাতা।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোল করার বিশ্বরেকর্ডটি বর্তমানে রোনালদোর। পর্তুগালের হয়ে তার গোলসংখ্যা ১৪৬টি। পুরুষ ফুটবলের ইতিহাসে আর কোনো খেলোয়াড় এই সংখ্যা স্পর্শ করতে পারেননি। ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে এই অনন্য রেকর্ডটি নিজের করে নেন তিনি। সেই দিনে ইরানের কিংবদন্তি ফুটবলার আলী দাইয়ির গড়া আগের বিশ্বরেকর্ডটি তিনি ভেঙে দেন।

এই তালিকায় রোনালদোর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা ১২৬টি। অর্থাৎ মেসির চেয়ে ২০টি গোলে এগিয়ে আছেন রোনালদো।

রোনালদোর মোট ১৪৬টি গোলের বিস্তারিত পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায়—বিশ্বকাপের মূল পর্বে ১১টি, ইউরোতে ১৪টি, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ৪১টি এবং ইউরোর বাছাইপর্বে ৪১টি গোল করেছেন তিনি। এছাড়া নেশন্স লিগে ১৫টি, কনফেডারেশনস কাপে দুটি এবং বিভিন্ন প্রীতি ম্যাচে ২২টি গোল তার নামের পাশে যুক্ত হয়েছে।

গোলের পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার বিশ্বরেকর্ডটিও তার দখলে। পর্তুগালের হয়ে এখন পর্যন্ত ২৩৪টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে লিচেনস্টাইনের বিপক্ষে নিজের ১৯৭তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমে নতুন ইতিহাস গড়েন রোনালদো। সেই ম্যাচে তিনি কুয়েতের বদর আল-মুতাওয়ারের ১৯৬ ম্যাচের রেকর্ড ভেঙে দেন এবং জোড়া গোলও করেন। একই বছরের জুনে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম পুরুষ ফুটবলার হিসেবে ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। স্মরণীয় সেই ম্যাচের ৮৯তম মিনিটে জয়সূচক গোলটি করেছিলেন তিনি।

রোনালদোর অন্যতম বিস্ময়কর একটি কীর্তি হলো আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানা ২৩ বছর গোল করা। ২০০৪ সালে পর্তুগালের হয়ে প্রথম গোল করার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই অন্তত একটি করে গোল করেছেন তিনি। এর আগে আয়ারল্যান্ডের রবি কিন ১৯৯৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত টানা ১৯ বছর আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোল করেছিলেন। রোনালদো সেই রেকর্ডটি অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত গোল করা তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতার এক বড় প্রমাণ।

বিশ্বকাপের ইতিহাসেও রোনালদো এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন। তিনিই প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র পুরুষ ফুটবলার, যিনি ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। ২০০৬ সালে জার্মানিতে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে গোল করেছিলেন তিনি। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও তিনি গোলের দেখা পান। চলতি বছরের বিশ্বকাপে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নতুন ইতিহাস গড়েন পর্তুগিজ অধিনায়ক। এর আগে পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ডে মেসির সঙ্গে যৌথভাবে ছিলেন রোনালদো। তবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও গোল করে এককভাবে এই রেকর্ডের মালিক হন তিনি।

বিশ্বকাপে মোট ১১ গোল করেছেন রোনালদো। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ১০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করার পর গত ২ জুলাই ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আরও একটি গোল করেন তিনি। সেটিই ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার প্রথম গোল। এর মাধ্যমে পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল করার তালিকায় কিংবদন্তি ইউসেবিওকেও ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে এক আসরেই ৯ গোল করেছিলেন ইউসেবিও। অন্যদিকে ছয় আসরে ২৭ ম্যাচ খেলে ১১ গোল করেছেন রোনালদো।

বিশ্বকাপের মূল পর্বের পাশাপাশি বাছাইপর্বেও দীর্ঘ সময় দাপট দেখিয়েছেন রোনালদো। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তার ৪১টি গোল পুরুষ ফুটবলে সর্বোচ্চ। নিজের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ইউরোপীয় অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে নিয়মিত গোল করেছেন তিনি। বয়স বাড়ার পরও পর্তুগালের আক্রমণভাগে তাঁর প্রভাব ধরে রাখার অন্যতম উদাহরণ এই রেকর্ড। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বেও তিনি ৪১ গোল করেছেন। ফলে দুটি প্রতিযোগিতার বাছাইপর্ব মিলিয়েই তাঁর মোট গোলসংখ্যা ৮২টি।

ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও রোনালদোর রেকর্ডের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেকর্ড ছয়টি ইউরো আসরে খেলেছেন তিনি। ইউরোর মূল পর্বে তার ম্যাচসংখ্যা ৩০টি এবং গোল ১৪টি। দুটি ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড তার দখলে। বাছাইপর্বসহ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে মোট ৭৪ ম্যাচ খেলেছেন রোনালদো এবং গোল করেছেন ৫৫টি। এই দুটি পরিসংখ্যানেও তিনি সবার ওপরে রয়েছেন।

এছাড়া পাঁচটি ভিন্ন ইউরো আসরে গোল করার রেকর্ডও তার। ২০০৪, ২০০৮, ২০১২, ২০১৬ ও ২০২০ সালের আসরে গোল করেছিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা। ২০১২, ২০১৬ ও ২০২০ সালের ইউরোতে অন্তত তিনটি করে গোল করার কীর্তিও রয়েছে তার। একাধিক ইউরোতে তিন বা তার বেশি গোল করা একমাত্র ফুটবলার তিনি।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুটি আন্তর্জাতিক আসর হলো বিশ্বকাপ ও ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। এই দুই প্রতিযোগিতার মূল পর্ব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোলের রেকর্ডও রোনালদোর। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে ৫৭ ম্যাচ খেলেছেন তিনি এবং গোল করেছেন ২৫টি। এর মধ্যে বিশ্বকাপে ২৭ ম্যাচে ১১ গোল এবং ইউরোয় ৩০ ম্যাচে ১৪ গোল। উয়েফার হিসাব অনুযায়ী, দুই প্রতিযোগিতার সম্মিলিত পরিসংখ্যানে এই দুটি রেকর্ডই তার দখলে।

জাতীয় দলের হয়ে হ্যাটট্রিকের ক্ষেত্রেও অনন্য নজির গড়েছেন রোনালদো। পুরুষ আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১০টি হ্যাটট্রিক করার মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। ২০২১ সালের অক্টোবরে লুক্সেমবার্গের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে এই কীর্তি গড়েছিলেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। জাতীয় দলের হয়ে তার ১০টি হ্যাটট্রিকের মধ্যে দুটি ম্যাচে চারটি করে গোল করার নজিরও রয়েছে।

ব্যক্তিগত রেকর্ডের বাইরেও দেশের হয়ে বড় অর্জন রয়েছে রোনালদোর। ২০১৬ সালে তার নেতৃত্বেই প্রথমবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ সালে উয়েফা নেশন্স লিগের প্রথম আসরেও চ্যাম্পিয়ন হয় পর্তুগিজরা। ২০২৫ সালে স্পেনকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার নেশন্স লিগের শিরোপা জেতে রোনালদোর দল।

তবে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে তার। চলতি বছরের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। সেই আসরই ছিল রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ। এবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও বিদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। যদিও নভেম্বরের দুটি ম্যাচ এখনো বাকি থাকায় তার ম্যাচ ও গোলের সংখ্যা আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সেই ম্যাচগুলোতে তিনি খেলবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

সেই সংখ্যা শেষ পর্যন্ত যেখানেই থামুক, বিশ্ব ফুটবলে রোনালদোর রেকর্ডের তালিকা দীর্ঘদিন আলোচিত হবে। ২৩ বছরের যাত্রায় ব্যক্তিগত অসংখ্য কীর্তির পাশাপাশি পর্তুগালকে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতাতে ভূমিকা রেখেছেন তিনি। জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখলেও তার গড়া বহু রেকর্ড নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।