বয়স তাঁর জন্য এখন কেবলই একটি সংখ্যা। ৪১ বছর পার করেও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ফুটবল বিশ্বে তাঁর চেয়ে বড় গোলমেশিন আর দ্বিতীয় কেউ জন্মায়নি। সিএনএন পর্তুগালকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ‘পর্তুগিজ যুবরাজ’ নিজেই ইতিহাসসেরা হওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘আমার নামের পাশে সংখ্যাগুলোই সব বলছে।’
তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই রহস্যজনকভাবে চ্যানেলটির ওয়েবসাইট থেকে উধাও হয়ে যায়।
ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ারে ১০০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে এখন আর মাত্র ২০টি গোলের প্রয়োজন রোনালদোর। এমন এক অনন্য কীর্তির একদম দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পর্তুগিজ এই মহাতারকার মনে আনন্দের পাশাপাশি কিছুটা অভিমানও জমেছে। তাঁর মনে হচ্ছে, এত বিপুল পরিমাণ গোল করার পরেও তিনি প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকু পাচ্ছেন না। তাঁর পারফরম্যান্স, গোল করার ধারাবাহিকতা, এমনকি ফুটবল ইতিহাসে তাঁর প্রকৃত অবস্থানকেও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।
তবে ইতিহাসের সেরা ফুটবলার কে, সেই প্রশ্নের উত্তর রোনালদোর কাছে অত্যন্ত পরিষ্কার। কোনো দ্বিধা বা সংশয় ছাড়াই সেরার আসনে তিনি নিজেকেই দেখেন। আর এর অকাট্য প্রমাণ হিসেবে তিনি সামনে আনেন নিজের গোলসংখ্যাকে। সিএনএন পর্তুগালকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে ৪১ বছর বয়সী রোনালদো বলেন, ‘আমি যে ছন্দে আছি, আমার গোলগুলো, মানুষ সেসবের যথাযথ মূল্যায়ন করছে না।’
ক্লাব এবং জাতীয় দল মিলিয়ে পেশাদার ক্যারিয়ারে মোট ১৩৩৭ ম্যাচে ৯৮০টি গোল করেছেন রোনালদো। অবিশ্বাস্য এই মাইলফলকের এত কাছে এসেও সংখ্যাটিকে নিজের ওপর চাপ হয়ে বসতে দিতে চান না সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের এই ফরোয়ার্ড। সাক্ষাৎকারে যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, ১০০০ গোলের মাইলফলকই কি এখন তাঁর মূল লক্ষ্য, তখন রোনালদোর উত্তর ছিল, ‘সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই ঘটতে দিতে হবে।’
এরপরই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা দেন তিনি, ‘আমি যদি ৯২০, ৯২৫ কিংবা ৯৩০ গোলও করতাম, তাহলেও ইতিহাসের সেরা আমিই। ব্যস, এটাই শেষ কথা। সংখ্যাগুলোই তো কথা বলে। ১০০০ গোলে পৌঁছাতে পারলে সেটা হবে অসাধারণ ব্যাপার। এটা একটা লক্ষ্য। তবে আমি দীর্ঘ মেয়াদে ভাবি না।’
সম্প্রতি পর্তুগাল জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে তাঁর আকস্মিক বিদায় এবং পরবর্তীতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার ঘটনায় রোনালদোকে নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক বিরতির মাঝপথে তিনি জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গত শনিবার পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ) তাঁর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েছেন এই পর্তুগিজ তারকা।
তবে সেই নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার আগেই পর্তুগালের কোচ জর্জ জেসুসের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছিলেন রোনালদো। তাঁর দাবি, জেসুস কথা রাখেননি। শুধু তা-ই নয়, জাতীয় দল থেকে তাঁর আকস্মিক বিদায়ের পেছনের ঘটনা নিয়েও কোচ ভুল তথ্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ১৭৪০ শব্দের এক দীর্ঘ বিবৃতিতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন রোনালদো। সেখানে তিনি জানান, জাতীয় দল থেকে এখনই অবসর নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। বরং পর্তুগালের জার্সিতে ‘একটি বা একাধিক বিদায়ী ম্যাচ’ খেলার আশা করছেন তিনি।
বিবৃতিতে রোনালদো আরও উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর সঙ্গে জেসুসের কথা হয়েছিল—নরওয়ের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে তাঁকে না খেলানোর জন্য কোচ জেসুস দুঃখ প্রকাশ করবেন এবং ফুটবলে তাঁর অবস্থানকে পেলে কিংবা ডিয়েগো ম্যারাডোনার সমপর্যায়ের হিসেবে বর্ণনা করে ক্ষমা চাইবেন। কিন্তু কোচ সেই কথা রাখেননি বলে দাবি করেন তিনি।
২০০৩ সাল থেকে পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে খেলে আসছেন রোনালদো। আন্তর্জাতিক ফুটবলে পুরুষদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪৬ গোলের রেকর্ডটি তাঁর দখলে। ক্লাব ক্যারিয়ারে তিনি স্পোর্তিং লিসবন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাসের হয়ে খেলেছেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তিনি দুই মেয়াদে খেলেছেন। বর্তমানে তাঁর ঠিকানা সৌদি আরবের আল নাসর।
তবে এই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ কোথায়, সেটি রোনালদো নিজেও নিশ্চিত করে বলছেন না। এক মাস আগে তিনি জানিয়েছিলেন, আগামী জুনে ক্লাব মৌসুম শেষ হলে সম্ভবত অবসর নেবেন।
সিএনএনের সাক্ষাৎকারেও অবসরের প্রসঙ্গটি উঠে এসেছিল। এবার অবশ্য রোনালদোর কথায় অনিশ্চয়তার সুর শোনা যায়, ‘আগামীকাল কী ঘটবে, আমি জানি না। হয়তো ঘুম থেকে উঠে দেখব, খেলার কোনো প্রেরণাই পাচ্ছি না। তখন আর খেলতে চাইব না। আসলে আমি জানি না।’
রোনালদোর এই সাক্ষাৎকারটি ঘিরে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই সিএনএন পর্তুগাল সেটির ভিডিও এবং লিখিত সংস্করণ সরিয়ে নেয়। কেন এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি সিএনএন পর্তুগাল।