ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বরুনাগাঁও গ্রামে অবস্থিত একটি পাপোশ কারখানার মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলছেন এলাকার অনেক নারী। এই কারখানায় কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন প্রায় দেড় শতাধিক নারী, আর খণ্ডকালীন ভিত্তিতে কাজ করছেন আরও প্রায় ৫০ জন। সকাল থেকে শুরু হয়ে কারখানার খুটখাট শব্দের ব্যস্ততা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার ভেতরে নারীরা অত্যন্ত কর্মব্যস্ত। কেউ পাপোশ তৈরি করছেন, কেউ রশি তৈরির কাজে নিয়োজিত, আবার কেউ ব্যস্ত আছেন রঙ এবং ফিনিশিংয়ের কাজে।
এই কারখানার শ্রমিক নাজমা বেগম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “আমি প্রায় ৩ বছর ধরে এই পাপোশ কারখানায় কাজ করছি। মাসে ভালো টাকা ইনকাম করি। পাপোশ তৈরি করে যা টাকা পাই সংসারের খরচ চলে, বাচ্চার পড়াশোনার খরচ চলে, নিজের জন্য কাপড় চোপড় কিনি, অবশিষ্ট টাকা স্বামীর হাতে তুলে দেই এখন আর সংসারে অভাব নাই আমার। বেশ ভালো আছি পরিবার নিয়ে”।
কারখানার আরেক শ্রমিক বিলকিস আক্তার জানান, ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তিনি পড়াশোনা করতে পারেননি। তাঁর স্বামী একজন রিকশাচালক, যাঁর সামান্য আয়ে সংসার চালানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। বিলকিস আক্তার বলেন, “আমি ৩ মাস এই কারখানায় কাজ শিখছি। এখন ২ বছর ধরে এই কারখানায় কাজ করছি। বেতন পাই বেশ ভালো। অভাবের সংসারে আমার ইনকাম দিয়ে এখন অভাব নেই বললে চলে। ২ ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছি আমার টাকা দিয়ে। সংসারে সহযোগিতা করতে পারছি। এখন ভালোই আছি।”
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কথা উল্লেখ করে শ্রমিক নাজু আক্তার বলেন, “জিনিসপত্রের যা দাম। বর যা কামাই করে তা সংসারের খাবার কিনতে শেষ। বাচ্চার পড়াশোনা, কাপড়-চোপড় হয় না। আমাদের জন্য এই কারখানার পাপোশ তৈরির কাজটা অনেক উপকার হয়েছে। মাসে ১০-১২ হাজার টাকা ইনকাম করি। সবমিলে এখন পরিবার নিয়ে ভালো আছি।”
পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করছেন সুমি আক্তার। তিনি বলেন, “পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে পাপোশ তৈরি করি। এতে আমার পড়াশোনার খরচ পরিবার থেকে নিতে হয় না। নিজে চলি এবং পরিবারকে সাহায্য করতে পারি।”
অন্যদিকে, ফাতেমা বেগম নামের আরেক নারী জানান, তিনি পাপোশ তৈরি, সেলাই এবং ফিনিশিংয়ের সব কাজই পারেন। তিনি বলেন, “পাপোশ তৈরি করা, সেলাই করা, ফিনিশিং দেওয়া সবকিছুই আমি করি। এখানকার নারীরা কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। মাসে আমরা প্রায় ১৫-১৬ হাজার টাকা উপার্জন করি।”
এই সফল উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন উদ্যোক্তা হুমায়ুন কবির। চাকরির পেছনে না ছুটে নতুন কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালে তিনি ক্ষুদ্র পরিসরে পাপোশ তৈরির কাজ শুরু করেন। শুরুর দিকে অনেক বাধা-বিধার সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময়ে ব্যবসাটি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল, তবে তিনি হাল ছাড়েননি। পরবর্তীতে জেলার একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় তিনি পুনরায় ঘুরে দাঁড়ান। বর্তমানে তিনি এই কারখানার মাধ্যমে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন এবং দুই শতাধিক নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। নিজের প্রচেষ্টায় উদ্যোক্তা হওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
হুমায়ুন কবির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “২০১৯ সালে পল্লি কর্মসংস্থান ও ইএসডিওর প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তিন লাখ টাকা ঋণ সহায়তা পাওয়ায় নতুন উদ্যমে পাপোশ তৈরির কাজ শুরু করি। আজ আমি স্বাবলম্বী হয়েছি। বর্তমানে এই কারখানায় ১৫০ জন নারী নিয়মিত এবং প্রায় ৪৮ জন নারী খণ্ডকালীন ভিত্তিতে কাজ করছেন।”
এ বিষয়ে ইএসডিওর রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা তাবরেদী রায় মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে মানুষকে যুক্ত করা এবং টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করা।”
ঠাকুরগাঁও বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে জানান, সঠিক প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহযোগিতা, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা এবং নিজের চেষ্টা থাকলে হুমায়ুন কবিরের মতো উদ্যোক্তা হয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন যে, হুমায়ুন কবির এক্ষেত্রে একটি উদাহরণ।