ঠাকুরগাঁও পীরগঞ্জ উপজেলায় হাঁসের খামার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন আব্দুল মজিদ ও নজরুল ইসলাম নামে দুই বন্ধু। তাদের খামারে বর্তমানে হাজার হাজার হাঁস রয়েছে। সেই হাঁসের ডিম থেকে ইনকিবিউটর দিয়ে ফোটানো হয় বাচ্চা। শুরুতে লাভ কম হলেও হাঁসের মাংস, ডিম, বাচ্চা ও মাছ বিক্রি করে প্রতিবছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয় করছেন দুই খামারি।
দুই খামারির সাফল্যে উৎসাহিত হচ্ছে আশপাশের মানুষ। ফলে বেকারত্ব দূর করে অনেক পরিবারের জন্য তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান ও নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল খামার থেকে সারি সারি দলবেঁধে বের হচ্ছে হাঁস। পাশেই খামারিরা প্রস্তুত করছেন তাদের খাবার। হাঁসগুলো প্রতিদিন খামার থেকে এভাবে বেরিয়ে নেমে পড়ে পুকুরে, আবার বেলা শেষে ফেরে খামারে।
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার কেষ্টপুর গ্রামে আব্দুল মজিদ ও নজরুল ইসলাম অল্প কয়েকটি হাঁস দিয়ে শুরু করেছিলেন এই খামার। বিশাল খামার দেখাশোনার পাশাপাশি পুকুরে চলে মাছ চাষ, হাঁসের বিষ্ঠা ও বর্জ্য খাবার হিসাবে জোগান হয় মাছের। শুধু হাঁস পালন নয় এখানে ইনকিবিউটরের মাধ্যমে ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানোর কাজও করা হয়। শুরুতে লাভ কম হলেও হাঁসের মাংস, ডিম, বাচ্চা ও মাছ বিক্রি করে প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয় করছেন এই খামারিরা। ফলে বেকারত্ব দূর করে অনেক পরিবারের জন্য তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান।
পাশের গ্রাম থেকে হাঁসের খামার দেখতে আসা মিল্লাদ হোসেন বলেন, আমি এই হাঁসের খামার দেখতে আসি প্রায়। কারণ আমিও আমার বাড়িতে একটা খামার শুরু করব। এই খামার দেখে শিখছি কিভাবে হাঁস পালন করা হয় এবং একই সঙ্গে মাছ চাষ করা হয়। আমি বেকার, অল্প কিছু পুঁজি নিয়ে এই দুই খামারির মতো হাঁস পালন শুরু করতে চাই।
আরেক দর্শনার্থী বাবুল হক বলেন, ২ বন্ধু অল্প পুঁজি দিয়ে এই খামার শুরু করেছিল। এখন তাদের খামারে কয়েকহাজার হাঁস এবং মাছ চাষ করছে পাশাপাশি। এই খামারে ডিম দিয়ে বাচ্চা ফোটানো হয়। তাদের এখন মাসিক আয় কয়েক লক্ষ টাকা। তাই অনুপ্রাণিত হয়ে আমিও একটা হাঁসের খামার দেব এবং এদের কাছে পরামর্শ নেব।
খামারের কর্মচারী আবু বক্কর বলেন, আমি ২ বছর ধরে এই খামারে কাজ করি। আমার মতো আরও ৫ জন আছে। হাঁসগুলোকে খাবার দেওয়া, ডিম তোলা, বিষ্ঠা পরিষ্কার করার কাজগুলো করতে হয়। প্রথমে আমাকে মাসে ৭ হাজার টাকা করে দিত। কয়েকমাস আগে আমার বেতন বাড়ায় এখন ১২ হাজার টাকা করে দিছে। এতে আমার সংসার ভালোই চলে।
আরেক কর্মচারী আরজিনা বেগম বলেন, এখন মাঠে তেমন কাজ নেই। বাড়িতে বেকার হয়ে থাকতে হয়। তাই এই হাঁসের খামারে কাজ করি। বেতন ভালোই দেয়, মাসে ৯ হাজার টাকা। এতে বাচ্চাদের পড়াশোনাসহ পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে পারি।
খামার মালিক আব্দুল মজিদ বলেন, ৩ বছর আগে মাত্র ৪০টা হাঁস দিয়ে ২ বন্ধু খামার শুরু করি। শুরুতে অনেক সমস্যায় পড়ছি। লাভ কম হতো। হাঁস বিভিন্ন রোগে মারা যেত। কিভাবে কি করতে হবে জানা ছিল না। এখন আমাদের খামারে কয়েকহাজার হাঁস। পাশাপাশি পুকুরে মাছ চাষ করছি। ডিম দিয়ে বাচ্চা ফোটানোর কাজ করছি। এখন প্রতিবছরে ২৫/৩০ লাখ টাকা ইনকাম আমাদের। মাঝে মাঝে উপজেলা পানিসম্পদ কর্মকর্তা আসেন বিভিন্ন পরামর্শ দেন। এখন খামারে কোন সমস্যা নেই আমাদের।
আরেক মালিক নজরুল ইসলাম বলেন, শুরুতে লস হয়েছে। কারণ হাঁসের খামারের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তার পর আস্তে আস্তে বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং নিছি। কিভাবে হাঁসের খামারের পাশাপাশি মাছ চাষ করা যায়, বাচ্চা ফোটানো যায়। এখন আমরা সাকসেস। কোন সমস্যা নেই আমাদের খামারের। এই খামারে কাজ করে অনেকের কর্মস্থান হয়েছে। এখন আমাদের খামারে গড়ে প্রতিদিন ৬ জন কাজ করে। প্রতি মাসে তাদের ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। অনেক দূর থেকে মানুষজন এটা দেখতে আসে তারাও খামার করবে। আমরা তাদের পরামর্শ দেই। এবং সব ধরণের সহযোগীতার আশ্বাস দেই। আমরা চাই বেকারত্ব দূর হোক।
পীরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা ২ বন্ধুর খামার নিয়মিত পরিদর্শন করি। নানান রকম পরামর্শন দেই তাদের। তারা সফল। তাদের সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের হাঁস ও প্রয়োজনীয় টিকা, সহজ ঋণের ব্যবস্থা করব আমরা। এতে অধিক মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। হাঁস পালন এখন শুধু বাড়তি আয় নয়, এটি অনেক পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে নতুন কর্মসংস্থান ও গ্রামীন অর্থনেতিক সম্ভাবনার গল্প।