ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় এক পূজামণ্ডপে বিএনপির প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হাততালি দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনার পর আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটে ১৯ অক্টোবর পীরগঞ্জ উপজেলার সেনগাঁও ইউনিয়নের আমতলী পূজামণ্ডপে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মণ্ডপ পরিদর্শনে যান ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ উপজেলা ও রানীশংকৈল উপজেলার আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান। বিএনপি দলীয় এই সংসদ সদস্যের সঙ্গে পীরগঞ্জের ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মণ্ডপে বক্তব্য দেওয়ার এক পর্যায়ে জাহিদুর রহমান সেনগাঁও ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সাইদুর রহমানকে আগামী ইউপি নির্বাচনের জন্য বিএনপির দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “সাইদুর আপনাদের রানিং চেয়ারম্যান। আবারও সাইদুর রহমান অত্র ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী থাকবে।”
এই কথা শোনার পর সাইদুর রহমান তাঁর আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। ঠিক সেই মুহূর্তে সংসদ সদস্যের পাশে বসে থাকা ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদার হাততালি দিতে শুরু করেন। পরবর্তীতে উপস্থিত সাধারণ মানুষও হাততালি দিয়ে সাইদুর রহমানকে সমর্থন জানান। এরপর জাহিদুর রহমান আরও বলেন, “সবাই তাঁকে মনোনীত করবেন, ভোট দেবেন এবং এলাকায় আপনারা প্রচার চালাবেন। আমরা তাঁকে নমিনেশন দেব।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে সংসদ সদস্য উল্লেখ করেন, “কোনো দিন আপনারা ধানের শীষের এমপি বানাননি। স্বাধীনতার পর থেকে এইবারই প্রথম আপনাদের ভোটে আমরা নির্বাচিত হয়েছি।” এই কথা বলার সময়ও ইউএনওকে হাততালি দিতে দেখা যায়।
পরবর্তীতে জামায়াতকে ইঙ্গিত করে জাহিদুর রহমান বলেন, “এখানে আর একটা শক্তি ছিল, যারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। সেই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের পরাজিত করেছি। ঠিক স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ও আমরা তাদের পরাজিত করেছিলাম। সামনের প্রতিটি নির্বাচনেও তাদের প্রার্থী থাকবে। এ নিয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ আমরা এক থাকব।”
গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর পীরগঞ্জ ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই বিষয়ে এক সাংবাদিকের সঙ্গে ইউএনওর উত্তপ্ত কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডও প্রকাশ পেয়েছে। ওই অডিওতে সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক বক্তব্যে হাততালি দেওয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ইউএনওকে বলতে শোনা যায়, “শুধু কি আমি হাততালি দিছি, ওসি সাহেব দেয় নাই। ভালো করে দেখেন। না হলে ভালো করে লিখে দেন এমপির সঙ্গে ইউএনও নির্বাচনী প্রচারণায়। লিখে দেন।”
বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা চলছে শুনে ইউএনও আরও বলেন, “আপনি এভাবে বলেন...ইউএনও হচ্ছে- নাও ওয়ান অব দ্য বিএনপি লিডারস অব পীরগঞ্জ। যে দলের সরকার থাকবে, আমি সেই দলেরই নেতা। বোঝা গেছে মেসেজটা। আমার দল আছে, আমার দল সরকারি দল। আমার আদর্শ সরকারি দলের আদর্শ। আপনি লিখে দেন, যাতে সারা দেশে ভাইরাল হই। আই ওয়ান্ট টু বি ভাইরাল।”
কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি আরও দাবি করেন, “এমপির বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা আমার কেন, আমার সেক্রেটারিরই নাই। আমার ডিসি স্যারের নাই। আমার কমিশনার স্যারের নাই। তাহলে আমি কোন হেডমওয়ালা হইলাম। আমি হলাম ছোট্ট ইউএনও। পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা।”
ইউএনও আরও বলেন, “সব কাজ মাননীয় সংসদ সদস্যকে জিজ্ঞেস করে করতে হবে, চিঠিও আছে আমার কাছে। সব কাজ এমপি মহোদয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে করতে হয়। সবাই তালি দিচ্ছে, আমি না দিলে এমপি স্যার তো মাইন্ড করবে।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে গিয়ে পীরগঞ্জের ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদার বলেন, “এমপি মহোদয় পরিদর্শনের সময় আমাকে ও ওসি সাহেবকে নিয়ে গেছেন। সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেবেন, সেটা জানতাম না। হাততালির ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃত হয়ে গেছে।” সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই সাংবাদিকের সঙ্গে মন খুলে কথা বলেছিলাম।”
স্থানীয় রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় ইউএনওর এমন আচরণ মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নষ্ট করতে পারে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঠাকুরগাঁও জেলার সাধারণ সম্পাদক আবু সায়েম বলেন, “এমপি আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীকে পরিচয় করে দিচ্ছেন, আর ইউএনও অতি উৎসাহী হয়ে সেখানে হাততালি দিয়ে সমর্থন জানাচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নির্বাচনের সময় ইউএনও একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করলে ওই প্রার্থী প্রশাসনিকভাবে বাড়তি সুবিধা পাবেন কি না, সে প্রশ্নও তৈরি হবে।”
একই মত প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলার সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, “ইউএনওর এমন আচরণ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।”
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫ নম্বর বিধিতে সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউএনওর আচরণ বিধি পরিপন্থী কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক এই বিষয়ে জানান, “ভিডিওটি আমি দেখেছি। বিষয়টি নিয়ে আমি তাঁকে সতর্ক করেছি।”