কোচের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়েছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সেই ঘটনার পর থেকেই পর্তুগালের জার্সিতে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা চলছিল। অবশেষে দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন এই পর্তুগিজ মহাতারকা। তবে রোনালদোকে আরও কিছুদিন জাতীয় দলের সাথে রাখতে চেয়েছিলেন কোচ হোর্হে জেসুস। তিনি নিজেই রোনালদোকে খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই ফুটবলার। রোনালদোর এই ঘোষণার পর এবার মুখ খুলেছেন কোচ জেসুস। তিনি জানিয়েছেন, শিষ্যের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া এখন তার আর কিছু করার নেই।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে পর্তুগাল জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান রোনালদো। সেই ঘোষণার পর দেশটির টেলিভিশন চ্যানেল ক্যানাল ইলেভেনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান জাতীয় দলের কোচ হোর্হে জেসুস।

রোনালদোকে জাতীয় দলে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন জানিয়ে জেসুস বলেন, ‘এটি পুরোপুরি তার নিজের সিদ্ধান্ত। প্রথমবার দল ঘোষণার আগেই আমাদের এ বিষয়ে কথা হয়েছিল। আমি তাকে আমার সঙ্গে খেলা চালিয়ে যেতে বলেছিলাম। কারণ, আমার পাশে তাকে প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখন তার সিদ্ধান্ত আমাকে মেনে নিতেই হবে।’

অথচ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও রোনালদো ও জেসুসের সম্পর্ক নিয়ে পর্তুগিজ ফুটবলে তুমুল আলোচনা হয়েছিল। জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনায় কোচের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছিলেন রোনালদো। সেই বিরোধের রেশ থাকা অবস্থাতেই এবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালেন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।

তবে বিদায়ের ঘোষণার পর শিষ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কোনো কার্পণ্য করেননি জেসুস। তার মতে, পর্তুগালের ফুটবলে রোনালদোর অবদান কেবল গোল কিংবা শিরোপার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ফুটবলের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন তিনি।

রোনালদোর প্রশংসায় পর্তুগাল কোচ বলেন, ‘ক্রিশ্চিয়ানো বিশ্বজুড়ে পরিচিত একজন আদর্শ ফুটবলার। তিনি পর্তুগাল ও জাতীয় দলের অন্যতম বড় প্রতীক। বছরের পর বছর দেশের ফুটবলে অনেক অবদান রেখেছেন। পর্তুগালের তরুণদের জন্যও তিনি অনুপ্রেরণা। তার বেশির ভাগ সমর্থকই তরুণ।’

শুধু জাতীয় দলে নয়, ক্লাব ফুটবলেও রোনালদোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে জেসুসের। সৌদি আরবের আল নাসরে প্রায় এক বছর তারা একসঙ্গে কাজ করেছেন। সেই সময় থেকেই রোনালদোর ব্যক্তিত্ব, প্রভাব ও তরুণদের কাছে তার জনপ্রিয়তা কাছ থেকে দেখেছেন পর্তুগিজ কোচ।

সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে জেসুস জানান, রোনালদো শুধু পর্তুগালের জাতীয় দলের ইতিহাসেই নন, বরং দেশের মানুষের কাছেও সব সময় বিশেষ একজন হয়ে থাকবেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্যও তার এই দীর্ঘ ক্যারিয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

রোনালদোর প্রতি নিজের শ্রদ্ধার প্রমাণ দিতে বিশেষ একটি উদ্যোগও নিয়েছেন জেসুস। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের অডিটোরিয়ামে রোনালদোর একটি বিশাল ছবি স্থাপনের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। এর উদ্দেশ্য হলো, জাতীয় দলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ফুটবলারদের সামনে এই মহাতারকার অবদান ও আদর্শ তুলে ধরা।

জেসুস বলেন, ‘আমি অডিটোরিয়ামে তার একটি বড় ছবি রাখার ব্যবস্থা করেছি। যাতে তরুণ ফুটবলার এবং দলের অন্য সদস্যরা প্রতিদিন তাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখতে পারেন।’

তার এই উদ্যোগটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে রোনালদোর সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে জড়ালেও দেশের ফুটবলে শিষ্যের ঐতিহাসিক অবদানকে আলাদা করেই দেখছেন জেসুস। জাতীয় দল থেকে বিদায়ের পরও রোনালদোর উপস্থিতি যেন নতুন প্রজন্মের কাছে অনুভূত হয়, সেই ব্যবস্থাই করেছেন তিনি। তবে রোনালদোর বিদায় নিয়ে কথা বললেও সাম্প্রতিক বিরোধের প্রসঙ্গে নতুন করে কোনো মন্তব্য করেননি পর্তুগাল কোচ।

২০০৩ সালের আগস্টে কাজাখস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পর্তুগালের হয়ে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। এরপর ২৩ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন তিনি। পুরুষ আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোল করার দুটি বিশ্বরেকর্ডই তাঁর দখলে।

রোনালদোর নেতৃত্বে ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও জিতেছেন তিনি। তবে ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি তাঁর।

বৃহস্পতিবারের ঘোষণায় রোনালদো জানিয়েছেন, নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পর পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি তুলে রাখার পরিকল্পনা তাঁর। আগামী ১৪ নভেম্বর ডেনমার্ক ও ১৭ নভেম্বর ওয়েলসের বিপক্ষে পর্তুগালের ম্যাচ রয়েছে। তবে সেই ম্যাচ দুটিতে তিনি অংশ নেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

এদিকে রোনালদোর বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ সংবর্ধনা আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন। তবে সেই অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ কিংবা ধরন এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

জাতীয় দলের কোচ হিসেবে রোনালদোকে ছাড়া নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে জেসুসকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিরোধের পরও দেশের ফুটবলে তাঁর অবদান যে চিরস্থায়ী, সেটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন পর্তুগিজ কোচ।

জেসুসের ভাষায়, ‘তিনি সব সময় পর্তুগালের মানুষের হৃদয়ে থাকবেন। জাতীয় দলের ইতিহাসেও তাঁর জায়গা থাকবে। তিনি সব সময়ই পর্তুগিজ ফুটবলের একজন আদর্শ হয়ে থাকবেন।’