দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পর্তুগালের জার্সিতে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করা এই মহাতারকার বিদায়ে আবেগাপ্লুত ফুটবল বিশ্ব। তবে দেশের ফুটবলে এত বড় অবদান রাখা একজন খেলোয়াড়কে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভিডিওর মাধ্যমে বিদায় জানাতে রাজি নয় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ)।

রোনালদোর অসাধারণ ক্যারিয়ারকে সম্মান জানাতে বিশেষ বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করতে চায় সংস্থাটি। যেখানে সমর্থকেরা আরও একবার প্রিয় অধিনায়ককে সম্মান জানানো ও ভালোবাসায় সিক্ত করার সুযোগ পাবেন।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আবেগঘন ভিডিও প্রকাশ করে জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান রোনালদো। তার ঘোষণার পরপরই আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন। সেখানে পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই তারকার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি বিশেষ বিদায়ী সংবর্ধনা আয়োজনের ইচ্ছার কথা জানানো হয়।

বিবৃতির শুরুতেই রোনালদোকে পর্তুগালের 'চিরকালের অধিনায়ক' হিসেবে উল্লেখ করেছে ফেডারেশন। দেশের ফুটবলে তার অসামান্য অবদানের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

ফেডারেশনের বক্তব্য অনুযায়ী, রোনালদো শুধু একজন অসাধারণ ফুটবলারই নন, তিনি পর্তুগাল জাতীয় দলের চেতনা ও আত্মপরিচয়ের অন্যতম বড় প্রতীক। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তার নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ ও দেশের প্রতি ভালোবাসা পরবর্তী প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Uma história que fica para sempre. 𝙊𝙗𝙧𝙞𝙜𝙖𝙙𝙤 𝙥𝙤𝙧 𝙩𝙪𝙙𝙤, 𝘾𝙖𝙥𝙞𝙩𝙖̃𝙤 🐐⭐️ https://t.co/OSKr7L7xMW — Portugal (@selecaoportugal) November 5, 2026

Uma história que fica para sempre. 𝙊𝙗𝙧𝙞𝙜𝙖𝙙𝙤 𝙥𝙤𝙧 𝙩𝙪𝙙𝙤, 𝘾𝙖𝙥𝙞𝙩𝙖̃𝙤 🐐⭐️ https://t.co/OSKr7L7xMW

রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন। ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে তিনি পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও গোল করার বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। তবে ফেডারেশনের কাছে তার অবদান শুধু এসব সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

সংস্থাটির মতে, দেশের হয়ে প্রতিটি ম্যাচে রোনালদোর লড়াই, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে করা গোল এবং অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন পর্তুগালের প্রতি তাঁর নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রমাণ। ফুটবল মাঠের বাইরেও কোটি কোটি তরুণকে অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পর্তুগালের পরিচিতি বাড়াতেও বড় ভূমিকা রেখেছেন এই মহাতারকা।

এমন একজন কিংবদন্তিকে যথাযথ সম্মান ছাড়া বিদায় দিতে চায় না ফেডারেশন।

বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, রোনালদোর বিদায় আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন ছাড়া হতে দিতে তারা রাজি নয়। তার অসাধারণ ক্যারিয়ারের উপযুক্ত একটি বিদায়ী অনুষ্ঠানের আয়োজন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে চায় ফেডারেশন। সেখানে দেশ ও সমর্থকেরা আরও একবার রোনালদোকে সম্মান জানানোর সুযোগ পাবেন।

পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম আ বোলা জানিয়েছে, রোনালদোর জন্য বিশেষ সংবর্ধনা আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করলেও এখনো অনুষ্ঠানের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি ফেডারেশন। এটি কবে কিংবা কোথায় হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি। আনুষ্ঠানিক বিদায়ী ম্যাচ হবে, নাকি মাঠের বাইরে বিশেষ সংবর্ধনা, সেটিও নিশ্চিত নয়।

এদিকে ফেডারেশনের বিবৃতির পাশাপাশি রোনালদোকে ব্যক্তিগতভাবেও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সংস্থাটির সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েন্সা।

নিজের বার্তায় প্রোয়েন্সা বলেন, রোনালদো পর্তুগালের কাছে একজন ফুটবলারের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। তিনি একজন নেতা, আদর্শ ও জাতীয় বীর। অসংখ্য রেকর্ড কিংবা শিরোপার বাইরেও তার সবচেয়ে বড় অবদান দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করা।

প্রোয়েন্সার মতে, বিশ্বের যেখানেই পর্তুগালের নাম উচ্চারিত হয়েছে, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে রোনালদোর নামও সামনে এসেছে। দেশের পরিচিতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার এই ভূমিকা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ফেডারেশন সভাপতি আরও জানিয়েছেন, গত দেড় বছর ধরে বিভিন্ন বিষয়ে রোনালদোর সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা হয়েছে। সেই সহযোগিতার জন্যও পর্তুগিজ মহাতারকার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রোয়েন্সা বলেন, ‘পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের দরজা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্য সব সময় খোলা থাকবে।’

২০০৩ সালের ২০ আগস্ট কাজাখস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পর্তুগাল জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। এরপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের ফুটবলের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।

তার নেতৃত্বে ২০১৬ সালে প্রথমবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ সালে উয়েফা নেশন্স লিগের প্রথম আসরেও চ্যাম্পিয়ন হয় দলটি। ২০২৫ সালে দ্বিতীয়বারের মতো নেশন্স লিগের শিরোপা জয়ের স্বাদ পান রোনালদো।

জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোল ও সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার বিশ্বরেকর্ডের পাশাপাশি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং বিশ্বকাপেও অসংখ্য কীর্তি গড়েছেন এই তারকা। তবে বিশ্বকাপের ট্রফি অধরাই থেকে গেছে তার।

চলতি বছরের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। এরপরও জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন রোনালদো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে বিরোধ এবং জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনার পর তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

অবশেষে বৃহস্পতিবার জাতীয় দল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দেন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পর পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি তুলে রাখার পরিকল্পনা তার। তবে ১৪ নভেম্বর ডেনমার্ক কিংবা ১৭ নভেম্বর ওয়েলসের বিপক্ষে তিনি মাঠে নামবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সিদ্ধান্ত নিলেও ক্লাব ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে রোনালদোর। বর্তমানে সৌদি আরবের আল নাসরের হয়ে খেলছেন তিনি। ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করার লক্ষ্যও এখনো সামনে রয়েছে তার।

পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনও চায়, আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর সেই মাইলফলক অর্জন করুন রোনালদো। নিজেদের আবেগঘন বিবৃতির শেষাংশে ক্লাব ক্যারিয়ারে তার এই লক্ষ্য পূরণের জন্য শুভকামনা জানিয়েছে সংস্থাটি।

রোনালদোকে উদ্দেশ করে ফেডারেশন লিখেছে, ‘সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ, অধিনায়ক! এটি সব সময় তোমার ঘর হয়ে থাকবে। এবার এক হাজার গোলের পথে এগিয়ে যাও!’