আধুনিক এই জীবনে প্রায় বেশিরভাগ মানুষের অভিযোগ মানসিক শান্তি তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। যার যতটুকু শান্তির প্রয়োজন বলে মনে করেন তার থেকে অনেক দূরে তিনি। মানসিক শান্তিটা কি? কোথায় গেলে বা কি করলে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়? এমন প্রশ্ন যখন মানুষের মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন বিষেজ্ঞরা বলছেন, মানসিক শান্তিটা আসলে নিজের কাছেই। প্রয়োজন অনুযায়ী সেটা একেকজনের কাছে একেক রকম হয়ে ওঠে।

সাইকোলজি টুডেতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মনোবিজ্ঞানী মিশেল পি. মেইডেনবার্গ বলেন, অন্যের আচরণে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে অন্যের কথা বা আচরণকে ব্যক্তিগতভাবে নেয়া যাবে না।

চলুন দেখে নিই অন্যের কথা বা আচরণকে ব্যক্তিগতভাবে না নেওয়ার ৮টি উপায়-

সবাই আপনাকে পছন্দ করবে না

আপনি যেমন সব মানুষকে পছন্দ করেন না, তেমনি সবাই আপনাকেও পছন্দ করবে না। এটা মেনে নিতে হবে। তবে কারও অপছন্দের মানুষ হওয়া মানেই যে আপনার মধ্যে কোনো সমস্যা আছে, এমনটা না। অন্যের পছন্দ-অপছন্দ দিয়ে নিজেকে মূল্যায়ন করবেন না।

অন্যের মনের কথা নিজে থেকে ধরে নেবেন না

কেউ আপনার সঙ্গে কথা বলল না বা আপনার মেসেজের উত্তর দিল না। এর অর্থ এই না যে সে আপনাকে গুরুত্ব দেয় না। এমনও হতে পারে সে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু অনেক সময় আমরা আসল ঘটনা না জেনেই নিজে থেকে অনেক কিছু ধরে নিই। নিজের মতো করে নেতিবাচক চিন্তা করতে শুরু করি। এটা ঠিক না। তাই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ভাবুন, এটা আপনার অনুমান কিনা।

অন্যের আচরণের পেছনে তার নিজের সমস্যাও থাকতে পারে

কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করলে বা রাগী আচরণ করলে সেটি সবসমসয় আপনার কারণে না-ও হতে পারে। তার নিজের অনিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সমস্যা, হতাশা বা অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা থেকেও এমন আচরণ আসতে পারে। তাই অন্যের প্রতিটি নেতিবাচক আচরণ নিজের ওপর নেবেন না। এতে আপনারই মানসিক শান্তি নষ্ট হবে।

অন্যের নেতিবাচক আচরণের প্রভাব আপনার ওপর পড়তে দেবেন না

কেউ বিরক্ত হয়ে কথা বললে আপনিও কষ্ট পেতে পারেন বা অস্থির হয়ে পড়তে পারেন। তবে অন্যের রাগ বা হতাশা নিজের মধ্যে নিয়ে নেওয়ার কোনো দরকার নেই। তার অনুভূতিকে বুঝতে চেষ্টা করুন। কিন্তু নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট করবেন না।

কারও মেজাজ খারাপ থাকলে নিজেকে দায়ী ভাববেন না

কেউ আপনার সঙ্গে খুব কড়া গলায় কথা বললে প্রথমেই ভাববেন না যে আপনি কোনো ভুল করেছেন। ক্লান্তি, কাজের চাপ, ব্যক্তিগত সমস্যা বা হতাশার কারণেও মানুষ খারাপ আচরণ করতে পারে। প্রয়োজন হলে সরাসরি জানতে চান, তার কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। অন্যের ব্যক্তিগত সমস্যাকে বুঝতে চেষ্টা করুন, কিন্তু এটা নিয়ে মন খারাপ করে থাকবেন না।

প্রত্যাখ্যান আপনার যোগ্যতা নির্ধারণ করে না

কেউ আপনাকে পছন্দ করল না, কোনো সম্পর্ক টিকল না বা প্রত্যাখ্যান করল অথবা কোনো সুযোগ আপনার হাতছাড়া হলো। এসব ঘটনা কখনোই আপনার ব্যক্তিগত মূল্য কমিয়ে দেয় না। মানুষের পছন্দ ও প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে। প্রত্যাখ্যানকে নিজের অযোগ্যতা হিসেবে দেখবেন না। আপনি আপনার জায়গায় সেরা।

অন্যের প্রতিক্রিয়া থেকে শেখার চেষ্টা করুন

অন্যের আচরণ একেবারে উপেক্ষা করাও ঠিক না। কখনো কখনো তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে আপনি নিজের ভুল বা আচরণের কিছু দিক বুঝতে পারবেন। তাই সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করুন। সমালোচনা শুনলে সেটি যাচাই করুন। ভুল থাকলে স্বীকার করুন, তবে অযৌক্তিক সমালোচনায় নিজেকে ছোট করবেন না।

নিজের মানসিক অবস্থা ও সময়ের যত্ন নিন

কে কী বলল, কেন বলল বা আপনাকে নিয়ে কী ভাবছে, এসব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিন্তা করে সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই। এতে মানসিক ক্লান্তি বাড়ে। বারবার পুরোনো কথা মনে না করে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দিন। প্রয়োজনে ব্যক্তিগত সীমারেখা তৈরি করে অপ্রয়োজনীয় নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকুন।

অন্যের আচরণ আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। কিন্তু সেই আচরণের প্রতিক্রিয়ায় আপনি কী করবেন, তা অনেকটাই আপনার হাতে। কেউ আপনাকে অপছন্দ করলেই আপনার মূল্য কমে যায় না। আবার কারও রাগ বা হতাশার দায়ও সব সময় আপনার না।

মনোবিজ্ঞানী মেইডেনবার্গের মতে, অন্যের আচরণে প্রভাবিত হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেটিকে নিজের মূল্যায়নের মাপকাঠি বানানো উচিত না। সবকিছু ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার অভ্যাস কমাতে পারলে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা সহজ হয়।

তথ্যসূত্র: সাইকোলজি টুডে