মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, একজন মানুষের নিজেকে জাহির করার প্রবণতার পেছনে যেমন সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করতে পারে, তেমনি এর গভীরে লুকিয়ে থাকতে পারে নিজের সম্পর্কে এক ধরণের অনিশ্চয়তা। অন্যের কাছ থেকে পাওয়া প্রশংসা, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক কিংবা ইতিবাচক মন্তব্য সাময়িকভাবে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা নিজের প্রকৃত মূল্যবোধকে অন্যের প্রতিক্রিয়ার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
নিজের অর্জন, অভিজ্ঞতা কিংবা সম্পদ প্রদর্শন করলেই কাউকে সরাসরি আত্মকেন্দ্রিক বলে আখ্যা দেওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজের ইতিবাচক দিকগুলো সবার সামনে তুলে ধরতে চায়; কারণ ভেতরে ভেতরে নিজের যোগ্যতা বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে তাঁর মনে সংশয় থাকে। অন্যের প্রশংসা পেলে সেই সংশয় কিছুটা প্রশমিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, কর্মক্ষেত্রে কোনো সাফল্যের কথা জানিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেলে একজন ব্যক্তি নিজের অর্জন সম্পর্কে আরও নিশ্চিত বোধ করতে পারেন।
তবে এই মানসিক স্বস্তি সাধারণত সাময়িক হয়ে থাকে। যখন বারবার প্রশংসা পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়, তখন মানুষ নিজের সাফল্য, বাহ্যিক চেহারা, সম্পদ কিংবা জীবনযাপনকে অন্যের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে নিজের প্রকৃত ভালো লাগার চেয়ে অন্যরা তাঁর সম্পর্কে কী ভাবছেন, সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে মানুষ সাধারণত জীবনের বাছাই করা সেরা মুহূর্তগুলোই প্রকাশ করে। আনন্দের ভ্রমণ, নতুন কেনাকাটা, পেশাগত সাফল্য কিংবা বিশেষ কোনো অর্জনের ছবি সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু সেই ঝলমলে মুহূর্তগুলোর পেছনে লুকিয়ে থাকা ক্লান্তি, হতাশা, ব্যর্থতা বা ব্যক্তিগত যাতনার কথা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
এর ফলে অন্যের জীবনের একটি অসম্পূর্ণ ছবি দেখে আমরা তাঁর পুরো জীবন সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে ফেলি। তখন মনে হতে পারে, সবাই খুব ভালো আছে, সবাই দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, আর শুধু নিজের জীবনেই সমস্যা। অথচ বাস্তবে অন্যদের জীবনেও দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা ও কঠিন সময় থাকে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সব সময় প্রদর্শিত হয় না।
লাইক, কমেন্ট ও ফলোয়ারের সংখ্যাও অনেকের কাছে সামাজিক স্বীকৃতির মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে। তখন অধিক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার নেশায় কেউ নিজের সাফল্য বাড়িয়ে বলতে পারেন, বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় জীবন তুলে ধরতে পারেন, এমনকি ফলোয়ারও কিনতে পারেন। এভাবে নিজের মূল্যবোধ বাইরের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের ভ্রমণ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কিংবা নতুন অভিজ্ঞতার ছবি দেখে মনে হতে পারে, কোনো আনন্দের মুহূর্ত থেকে নিজেই বাদ পড়ে যাচ্ছেন। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের অনুভূতিকে বলা হয় ফিয়ার অব মিসিং আউট বা ফোমো। অর্থাৎ অন্যরা এমন কোনো অভিজ্ঞতা উপভোগ করছেন, যা থেকে নিজে বঞ্চিত হচ্ছেন, এমন আশঙ্কা থেকে এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি হওয়া।
এই অনুভূতির পেছনে অন্যদের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অংশ হয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষা কাজ করতে পারে। বিবর্তনের ইতিহাসেও গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল; কারণ, দল থেকে বাদ পড়লে নিরাপত্তা ও সম্পদ পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারত। তবে আধুনিক জীবনে ফোমোর পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সামাজিক তুলনা এবং ব্যক্তিগত অনিশ্চয়তাও বড় ভূমিকা পালন করে।
অন্যের জীবনকে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করতে করতে কেউ কেউ এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েন। কে কোথায় ঘুরতে গেলেন, কার পোশাক বেশি দামি, কে বেশি সাফল্য পেলেন—এসবের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান প্রমাণ করার চেষ্টা শুরু হয়। তখন নিজেকে জাহির করার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছেন, তা দেখানো।
ভোগবাদী সংস্কৃতি আমাদের প্রতিনিয়ত বোঝায় যে, দামি পণ্য, বিলাসবহুল জীবনযাপন ও নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সাফল্যের পরিচায়ক। বিজ্ঞাপন ও বিপণনের প্রভাবেও অনেকে মনে করতে পারেন, বিশেষ কোনো পণ্য কিনতে পারলে তাঁরা আরও সুখী, আকর্ষণীয় বা সফল হয়ে উঠবেন।
এই ধারণা থেকে কেউ কেউ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনাকাটা করেন, যার মূল লক্ষ্য থাকে অন্যকে দেখানো। দামি ফোন, পোশাক, গাড়ি কিংবা ভ্রমণের ছবি তাঁদের কাছে সামাজিক মর্যাদা প্রকাশের উপায় হয়ে উঠতে পারে। এতে অন্যের চোখে নিজের অবস্থান উঁচুতে তুলে ধরার চেষ্টা যেমন থাকে, তেমনি নিজের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষাও থাকতে পারে।
সমস্যা তৈরি হয় যখন মানুষের মূল্যায়ন তাঁর চরিত্র, দক্ষতা ও আচরণের বদলে সম্পদ বা বাহ্যিক অর্জনের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে কেউ আর্থিক চাপেও পড়তে পারেন। তাই নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় খরচ বা ঋণের বোঝা বাড়ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
নিজের সাফল্য ভাগ করে নেওয়া, ভালো পোশাক পরা কিংবা আনন্দের মুহূর্তের ছবি প্রকাশ করা স্বাভাবিক আচরণ। শুধু এসব দেখে কারও আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে বা তিনি কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তবে কিছু আচরণ নিজের বা অন্যের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে উঠছে কি না, তা লক্ষ করা যেতে পারে। যেমন—
প্রশংসা না পেলে মন খারাপ হওয়া: নিজের অর্জন বা ছবি প্রকাশের পর প্রত্যাশিত লাইক, মন্তব্য কিংবা প্রশংসা না পেলে যদি বারবার আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা লাগে, তবে নিজের মূল্যবোধ কতটা অন্যের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে, তা ভেবে দেখা দরকার।
অন্যের সঙ্গে সারাক্ষণ তুলনা করা: কে কতটা সফল, কার জীবন কতটা আকর্ষণীয়, এসব ভাবনা যদি নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্টি বাড়ায়, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ধরন বদলানো উপকারী হতে পারে।
নিজেকে বড় দেখাতে বাস্তবতা আড়াল করা: অন্যের প্রশংসা পাওয়ার জন্য অর্জন বাড়িয়ে বলা, নিজের জীবন সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা দেওয়া কিংবা ব্যর্থতা স্বীকার করতে না পারা সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে।
দেখানোর জন্য সামর্থ্যের বাইরে খরচ করা: অন্যের কাছে সফল বা মর্যাদাবান মনে হওয়ার জন্য অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, ঋণ কিংবা আর্থিক ঝুঁকি নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
অন্যের সাফল্য সহ্য করতে না পারা: অন্য কেউ প্রশংসা পেলে ঈর্ষা, হীনম্মন্যতা বা নিজেকে ছোট মনে হওয়ার অনুভূতি যদি বারবার তৈরি হয়, তবে নিজের আত্মমূল্যায়ন ও তুলনা করার অভ্যাস নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
এসব আচরণ যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং সম্পর্ক, কাজ, আর্থিক অবস্থা কিংবা মানসিক স্বস্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
নিজেকে জাহির করার প্রবণতা কমাতে প্রথমেই বুঝতে হবে, নিজের মূল্য অন্যের প্রশংসা বা স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়। নিজের শক্তি ও দুর্বলতা দুটিই স্বীকার করা, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ঠিক করা এবং ছোট ছোট অগ্রগতির মূল্য দেওয়া আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের বাছাই করা মুহূর্তের সঙ্গে নিজের পুরো জীবনকে তুলনা না করাও জরুরি। প্রয়োজনে যেসব অ্যাকাউন্ট দেখলে নিজের জীবন নিয়ে অযথা অসন্তুষ্টি বাড়ে, সেসব কম দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি কাছের এমন মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার, যাঁদের কাছে সাফল্যের পাশাপাশি দুঃখ, ব্যর্থতা ও অনিশ্চয়তার কথাও নির্দ্বিধায় বলা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজেকে গ্রহণ করতে শেখা। ভুল করা, কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়া কিংবা জীবনের কোনো পর্যায়ে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। সব সময় নিজেকে নিখুঁত বা সফল প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।
অন্য কেউ যখন নিজের সাফল্য নিয়ে বেশি কথা বলেন, তখন তাঁকে দ্রুত অহংকারী বা আত্মকেন্দ্রিক বলে বিচার না করাই ভালো। তাঁর আচরণের পেছনে আত্মবিশ্বাস, আনন্দ, স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা কিংবা নিজের সম্পর্কে অনিশ্চয়তা—বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। সহানুভূতিশীল থাকা জরুরি, তবে তাঁর আচরণে যদি আপনার ক্ষতি হয় বা সম্পর্কের সীমারেখা লঙ্ঘিত হয়, তাহলে নিজের সীমা স্পষ্ট করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে