মেহেরপুরের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এই ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধটি বর্তমানে চরম অযত্ন, অবহেলা এবং ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে আছে। শহীদদের সম্মানে নির্মিত মূল স্মৃতিসৌধের চারপাশের বৈদ্যুতিক বাতিগুলো জ্বলছে না। দীর্ঘ সময় ধরে এখানকার সোলার লাইটগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে থাকলেও তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর পাশাপাশি কমপ্লেক্সের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরের ক্ষত রয়ে গেছে, যা এখন নিরাপত্তার বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সেখানে পুলিশের স্থায়ী ডিউটি থাকার কথা। কিন্তু সরেজমিনে একাধিক দফায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করেও কোনো পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে, চরম অন্ধকারের মধ্যেই আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
গত বুধবার (৪ নভেম্বর) রাত ১১টার দিকে সরেজমিনে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে গিয়ে এই করুণ চিত্র পরিলক্ষিত হয়। শুধু রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত নয়, একই রাতে দ্বিতীয় দফায় রাত ৩টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থান করেও কোনো পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
উল্লেখ্য যে, স্মৃতিসৌধ ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে সার্বক্ষণিক দুজন আনসার সদস্যের পাশাপাশি দিনে পুলিশের টহল এবং রাতে দুজন পুলিশ সদস্যের স্থায়ী ডিউটির ব্যবস্থা থাকার কথা। সরেজমিনে আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেলেও নির্ধারিত পুলিশ সদস্যদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্মৃতিসৌধ এলাকায় এমন অন্ধকার পরিস্থিতি সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এদিকে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা সোলার লাইটগুলো দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে থাকলেও সেগুলো সচল করার কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। মূল স্মৃতিসৌধের চারপাশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় রাতের বেলায় পুরো এলাকা অন্ধকারে ঢেকে থাকে। জাতীয় গুরুত্বের এই স্মৃতিচিহ্নের এমন করুণ দশা শুধু দর্শনার্থীদের চলাচলে বিঘ্নই ঘটাচ্ছে না, বরং স্মৃতিসৌধের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এই বিষয়ে মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুপায়ন দেব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “স্মৃতিসৌধে সার্বক্ষণিকভাবে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ডিউটি দেওয়া হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের পাশে একটি ডিউটি পোস্ট স্থাপন এবং আশপাশের বৈদ্যুতিক বাতি সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে স্মৃতিসৌধে গিয়ে দেখব, সেখানে কোনো বৈদ্যুতিক বাতি না থাকলে দ্রুত তা স্থাপনের উদ্যোগ নেব।”
অন্যদিকে মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “দিনে ও রাতে সার্বক্ষণিক মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে পুলিশের ডিউটি থাকে। দিনে ডিউটিরত বিভিন্ন পার্টি সেখানে টহল দেয়। আর রাতে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভেতরে পুলিশের স্থায়ী ডিউটি রয়েছে।”
তবে প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও সরেজমিনে নির্ধারিত সময়ে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। একই রাতে দুই দফায় কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করেও পুলিশের কাউকে দায়িত্ব পালন করতে না দেখায় বাস্তবে নিরাপত্তাব্যবস্থার তদারকি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
স্মৃতি কমপ্লেক্সের আলোকসজ্জা ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর সংস্কারের বিষয়ে জানতে মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর পদটি শূন্য থাকায় যোগাযোগ করা হয় খুলনা বিভাগীয় গণপূর্ত অধিদপ্তরে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স একটি বিশাল কম্পাউন্ড। সেখানে যেভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, তা মেরামত করতে যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন। এই মুহূর্তে আমাদের কাছে ফান্ড নেই। আমরা একটি এস্টিমেট করেছি, সেটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এখন গণপূর্তের নিজস্ব ফান্ড থেকে পুরো কমপ্লেক্স মেরামত করা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক জায়গায় লাইট নষ্ট হয়ে আছে, কোথাও কোথাও বৈদ্যুতিক কেব্লেরও সমস্যা রয়েছে। সবগুলো পরিবর্তন করতে হবে। আমি ইতিমধ্যে মেহেরপুর জেলা গণপূর্ত বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছি, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভেতরের লাইটগুলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করতে বৈদ্যুতিক তার ও লাইট স্থাপনের খরচের একটি এস্টিমেট তৈরি করতে। তারা একটি খসড়া এস্টিমেট করেছে। সেটি আমার কাছে এলে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠাব। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে অন্তত কমপ্লেক্সের ভেতরের লাইটগুলো জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হবে।”
মূল স্মৃতিসৌধটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকার বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, “আমি মেহেরপুর জেলা গণপূর্ত বিভাগকে নির্দেশনা দেব, অতি দ্রুত যেন স্মৃতিসৌধের আশপাশের এলাকায় নিজেদের ফান্ড থেকে লাইট স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে মেহেরপুরের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ও ঐতিহাসিক মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। ভাঙচুরের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি দৃশ্যমান পূর্ণাঙ্গ সংস্কারকাজ। ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্থাপনা সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় সেগুলো আগের অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে থাকা বৈদ্যুতিক বাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বেহাল দশা।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল। সেই ঐতিহাসিক স্থানের স্মৃতিচিহ্ন আজ রাতের অন্ধকারে অনিরাপদ ও অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে।