বাবার সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল প্রায় ২৬ বছর আগে। দীর্ঘ এই সময়ে মুঠোফোনে নিয়মিত কথা হতো, কখনো ভিডিও কলে দেখতেন বাবার মুখ। কিন্তু শেষবার যখন দেখা হলো, তখন বাবা আর কথা বললেন না। বার্ধক্যের নানা সমস্যায় প্রায় সাত বছর ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাবার পাশে দাঁড়াতে পারেননি মেয়ে। অবশেষে দেখা হলো, তবে তা ছিল সীমান্তের শূন্যরেখায় বাবার নিথর দেহের সামনে।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার স্বাধীনতা সড়কের ১০৫ নম্বর সীমান্ত পিলারসংলগ্ন শূন্যরেখার বেলতলায় এমন এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হন দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার বাসিন্দা মোনরুদ্দিন শেখের মরদেহ শেষবারের মতো দেখতে বাংলাদেশে বসবাসরত তাঁর বড় মেয়ে ফিরদৌসী খাতুন সেখানে এসেছিলেন।
জানা গেছে, ফিরদৌসী খাতুনের বিয়ে হয়েছিল প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বছর আগে। তাঁর স্বামী ইসরাফিলের বাড়ি মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের সোনাপুর নতুনপাড়ায়। বিয়ের পর থেকেই তিনি সেখানেই সংসার করছেন। অন্যদিকে, বাবা মোনরুদ্দিন শেখ থাকতেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাপড়া থানার হৃদয়পুর গ্রামে। বয়সের ভারে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মোনরুদ্দিন শেখ এবং দীর্ঘ সাত বছর শয্যাশায়ী থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে ফিরদৌসী সবার বড়।
স্মৃতিচারণ করে ফিরদৌসী খাতুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার যখন বিয়ে হয়েছিল, তখন সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। অবাধে সীমান্ত অতিক্রম করে দুই দেশে যাতায়াত করা যেত। এখন ভারতে যেতে হলে পাসপোর্ট–ভিসার প্রয়োজন পড়ে। তবে বাবা ও ভাইদের সঙ্গে নিয়মিত ইমোতে (ভিডিও ও অডিও কল এবং তাৎক্ষণিক বার্তা আদান–প্রদানের অ্যাপ) কথা হতো।’
বাবার অসুস্থতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বাবা প্রায় সাত বছর ধরে বার্ধক্যের নানা সমস্যায় বিছানায় পড়ে ছিলেন। সন্তান ও সংসারের ঝামেলায় বাবার কাছে যেতে পারিনি। দরিদ্র পরিবার হওয়ায় পাসপোর্ট–ভিসা করে যাব, তারও উপায় ছিল না।’
ফিরদৌসী জানান, ২০০০ সালের মার্চ মাসে তিনি ও তাঁর স্বামী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে বাবার বাড়ি গিয়েছিলেন। তবে সেই সময়ে তাঁর স্বামীকে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ভারতের কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁরা দেশে ফিরে আসেন। এরপর আর কখনো তাঁরা ভারতে যাননি।
বাবার মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর অন্তত শেষবারের মতো তাঁর মুখ দেখার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেন ফিরদৌসী। এই মানবিক আবেদনের বিষয়টি সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে জানানো হয়। এরপর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সীমান্তের শূন্যরেখায় মরদেহ দেখার বিশেষ ব্যবস্থা করে।
ভারতের দিক থেকে মোনরুদ্দিন শেখের মরদেহ নিয়ে আসেন তাঁর স্বজনেরা। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে সেখানে পৌঁছান ফিরদৌসী। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বিজিবির মুজিবনগর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার এনায়েত হোসেন। ভারতের পক্ষে ছয় সদস্যের একটি দলের নেতৃত্ব দেন বিএসএফের এএসআই সুনীল কুমার।
চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মানবিক বিবেচনায় সীমান্তের শূন্যরেখায় বাবার মরদেহ দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।’