জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা সামান্তা শারমিন দলটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যখন তরুণদের নেতৃত্বে এই দলটির গঠন হয়, তখন তিনি দলের জ্যেষ্ঠ আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে এনসিপি গঠনের ভিত্তি হিসেবে যে জাতীয় নাগরিক কমিটি কাজ করেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সামান্তা শারমিন সেই কমিটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র প্রেরণ করেন। উল্লেখ্য, এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে পদাবনতির দুই সপ্তাহ পর তিনি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
দল ত্যাগের কারণ হিসেবে চারুকলা শিক্ষার্থী সামান্তা শারমিন জানান, নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ বা ‘লাইন’ স্পষ্ট না থাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টি বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। তার মতে, গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের এই দলটিকে এখন বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের জন্য প্রতিক্রিয়া জানানো এবং সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। সামান্তা শারমিনের বিশ্বাস, এনসিপি একটি ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের ‘লেজুড়’ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দলটির নিজস্ব নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিয়েছে। এছাড়া এনসিপির বর্তমান ভূমিকা নারীবিরোধী রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি, কাউন্সিল প্রক্রিয়া এড়িয়ে এনসিপির কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়েও তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
সামান্তা শারমিন তার একটি ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেছেন যে, এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও এনসিপি তাদের গতিপথ পরিবর্তন করতে আগ্রহী হয়নি। আর এই কারণেই তিনি দল থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র হয়েছিলেন সামান্তা শারমিন। পরবর্তীতে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপির আত্মপ্রকাশের সময় তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ডিসেম্বরে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকে দলীয় কার্যক্রমে তিনি অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটিতে তাঁকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়।
পদত্যাগের বিষয়ে আজ সন্ধ্যায় মুক্তকণ্ঠকে সামান্তা শারমিন বলেন, ‘বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আমি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে হোয়াটসঅ্যাপে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছি। এ ছাড়া দলের গ্রুপেও সবাইকে পদত্যাগের বিষয়টি জানিয়েছি।’
এনসিপি ছাড়ার পর তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সামান্তা শারমিন ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, মানুষ তরুণদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশা নিয়ে, যারা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবে না; বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবে। গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলো এখনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় আছে।
তিনি আরও লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি দল গঠন করা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য নির্মাণ করা, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু বিভাজনই রাজনীতির চালিকা শক্তি হবে না; মতাদর্শের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্যকে তা গ্রাস করবে না; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান থাকবে না। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তরুণসমাজ যদি আবার সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ নেয়, তবে তা হতে হবে অতীতের কোনো দলের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন প্রচেষ্টা।’
এই নতুন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাজ করতে যারা অঙ্গীকারাবদ্ধ, তাদের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান সামান্তা শারমিন এবং সবাইকে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি আপনাদের সঙ্গে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে চাই।’