ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের সঙ্গে লংমার্চসহ বিভিন্ন বড় কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে এই দীর্ঘ সময়ে মাঠপর্যায়ে দলটির নিজস্ব উদ্যোগে বড় ধরনের কোনো সভা বা সমাবেশ সেভাবে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। ফলে লংমার্চের রাজনীতির ‘ফসল’ আলাদা দল হিসেবে এনসিপির জন্য কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, তা নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে নানা ধরনের মতভেদ দেখা দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের অংশ হয়েও পৃথক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে এনসিপি নিজেদের ‘স্বতন্ত্র পরিচয়’ বজায় রাখতে আগ্রহী। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ১১–দলীয় ঐক্যের খুলনা বিভাগীয় লংমার্চের ঠিক একদিন আগে, আগামীকাল শুক্রবার ঢাকার শাহবাগে এক গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে দলটি। এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার যৌথ প্রচেষ্টায় এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পরিচালিত হবে।
আগামী ২৩ অক্টোবর থেকে এই গণবিক্ষোভের প্রস্তুতি হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রচারপত্র বিতরণ করছে এনসিপি। এসব প্রচার কার্যক্রমে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আবদুল্লাহ এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াসহ উচ্চপর্যায়ের নেতারা অংশ নিয়েছেন। তবে লক্ষ্য করা গেছে, এসব কর্মসূচিতে তাঁদের ১১ দলের খুলনা অভিমুখী লংমার্চের পক্ষে তেমন কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি।
চট্টগ্রাম ও রংপুরের পর আগামী শনিবার (৩১ অক্টোবর) খুলনা বিভাগে যাত্রা করবে ১১ দলের লংমার্চের গাড়িবহর। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের লংমার্চে এনসিপির অংশগ্রহণ কেবল ‘প্রতীকী’ হয়ে উঠতে পারে। পূর্ববর্তী দুটি লংমার্চে এনসিপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকলেও, এবার প্রতিনিধি হিসেবে মাত্র দু–একজন নেতা সেখানে যেতে পারেন।
এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের একজন সদস্যের ভাষ্য, “১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চের বিষয়টি জনপরিসরে জামায়াতের কর্মসূচি হিসেবে একধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে।”
খুলনায় যেতে পারেন সারজিস
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ছয়জন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তাঁদের অধিকাংশের মতে, এনসিপিকে জামায়াতের সঙ্গে মিলিয়ে অনেকে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। কিন্তু এনসিপি ও জামায়াত যে সম্পূর্ণ আলাদা দল, দুই দলের মতাদর্শ ও সাংগঠনিক কাঠামো যে ভিন্ন, সেই বার্তাটি এনসিপি জোরালোভাবে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে চায়। আর সেই উদ্দেশ্যেই দলের নিজস্ব কর্মসূচি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে শাহবাগে গণবিক্ষোভের আয়োজন করা হচ্ছে। এনসিপির ঢাকার দুই মহানগর শাখার এই আয়োজনে দুই থেকে তিন হাজার মানুষের জমায়েত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্ষদের ওই সদস্য আরও জানান, ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চের বিষয়টি জনপরিসরে জামায়াতের কর্মসূচি হিসেবে একধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে। এনসিপি সর্বশক্তি নিয়ে আগের দুটি (চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগ) লংমার্চ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। কিন্তু এনসিপির পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, লংমার্চে গিয়ে পৃথক দল হিসেবে এনসিপির ‘ব্র্যান্ডিং’ সেভাবে হচ্ছে না এবং এটি এনসিপির সক্ষমতায়ও বেশি কিছু যোগ করছে না।
এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে কিছুটা সাংগঠনিক দূরত্ব বজায় রাখার চিন্তা করছে বলে জানান দলের রাজনৈতিক পর্ষদের আরেকজন সদস্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “১১ দলের খুলনা বিভাগীয় লংমার্চে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম না–ও যেতে পারেন। এখন পর্যন্ত যে আলোচনা হয়েছে, সে অনুযায়ী এনসিপির পক্ষ থেকে খুলনায় যাবেন সারজিস আলম। যদিও আগের দুটি লংমার্চে এনসিপির আহ্বায়ক-সদস্যসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নেতা অংশ নিয়েছেন। কিন্তু এবারের লংমার্চে এনসিপির প্রতীকী উপস্থিতি থাকবে।”
জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে নাহিদ ইসলামকে খুলনা বিভাগীয় লংমার্চে অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে এনসিপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। বুধবার ১১–দলীয় ঐক্যের নেতাদের একটি বৈঠকেও নাহিদ অংশ নিয়েছেন। ফলে লংমার্চে শেষ পর্যন্ত এনসিপি অংশ নেবে কি নেবে না, তা দেখার জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
তবে ১১ দলের লংমার্চের আগের দিন গণবিক্ষোভ আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আমাদের দুজন প্রার্থী। এখন মহানগরে আমাদের কমিটি পুনর্গঠন হবে। এর সঙ্গে জনসম্পৃক্ত বিষয়ে স্বতন্ত্র কর্মসূচি দিতে দলের ওপর একধরনের চাপ আছে। সব মিলিয়েই গণবিক্ষোভ কর্মসূচিটি হচ্ছে। এর সঙ্গে লংমার্চের কোনো বিরোধ নেই।”