রাজনৈতিক অঙ্গনে যাত্রার মাত্র ২০ মাস পূর্ণ হতে না হতেই প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও সক্ষমতার প্রমাণ দিতে চায় দলটি।

এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই করলেও, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি। এই লক্ষ্য অর্জনে এরই মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে দলটি। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১৯৫ সদস্যের একটি পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে শীর্ষস্থানীয় কিছু পদে রদবদল করা হয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন কমিটি গঠন এবং ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের স্থানীয় বাস্তবতার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এনসিপি নেতাদের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারির সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা। সেই লক্ষ্যেই দেশজুড়ে সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো ছড়িয়ে দেওয়ার পর রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোকে আরও বেগবান করা হবে।

যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রতীকবিহীন, তাই তৃণমূলের রাজনীতিতে এই উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত এনসিপি। প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ১০০টি পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের মেয়র ও চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী বাছাই করেছে দলটি। এছাড়া খুব দ্রুত ৫০০টি উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের ৪ হাজার ৬০০টি ইউনিয়নেও কমিটি ঘোষণা করা হবে।

গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর শাহবাগে এক গণবিক্ষোভ কর্মসূচির পর আয়োজিত সমাবেশে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জন্য আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রার্থী হিসেবে লড়বেন। উল্লেখ্য, এর আগে দল থেকে ঢাকা উত্তরে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রস্তুতি নিতে বলা হলেও পরবর্তীতে ‘কৌশলগত’ কারণে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়।

এছাড়া সিলেটে অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান আফজাল এবং রাজশাহীতে মোবাশ্বের আলীকে মেয়রপ্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে কুমিল্লা সিটির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম এর নাম আলোচনায় রয়েছে।

কেন্দ্রীয় কমিটির পুনর্গঠন প্রসঙ্গে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও দলীয় কাউন্সিল সামনে রেখে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। এতে আহ্বায়ক পদে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব পদে আখতার হোসেন বহাল রয়েছেন। তবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে আগের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন এই কাঠামোতে আগের কমিটির সাতটি পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।

পুনর্গঠিত কমিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আবদুল্লাহ পদোন্নতির মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নিযুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া হয়েছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব। আগের কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ এখন যুগ্ম আহ্বায়ক। এছাড়া আগের কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা এখন যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

নতুন এই কমিটিতে ২৪ জন যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ছয়জন যুগ্ম সদস্যসচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগে কোনো সম্পাদকীয় পদ না থাকলেও এবার ৩২টি সম্পাদকীয় পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, যাদের সাথে এক-দুজন করে সহসম্পাদক রয়েছেন। এছাড়া ১৯ জন সহসম্পাদক এবং ৫৮ জন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১১ জনকে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ২১৭ সদস্যের একটি কমিটি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এনসিপি। বর্তমান পুনর্গঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য সংখ্যা ১৯৫ জন। জানা গেছে, গত জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর অন্তত ১৮ জন নেতা দল ত্যাগ করেন।

দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদে বর্তমানে ১৬ জন সদস্য রয়েছেন। নতুন কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি এ কে ফ্লোরা, সাবেক বিএনপি নেতা ইসহাক সরকার এবং তারেক এ আদেল।

দলের পুনর্গঠন প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “সাংগঠনিক বিস্তৃতির লক্ষ্যে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের পর অনেকে দলে যুক্ত হয়েছেন। তাদের দায়িত্ব দিতে পুনর্বণ্টন দরকার ছিল। সামনে কাউন্সিল হবে। এর মধ্য দিয়ে এই কমিটি পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে রূপান্তরিত হবে।”

তৃণমূলের প্রস্তুতি ও জোটের হিসাব নিয়ে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারজিস আলম মুক্তকণ্ঠকে জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৫০০ উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৪ হাজার ৬০০ ইউনিয়নে কমিটি গঠন এবং দল-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণার লক্ষ্য রয়েছে।

ইউপি নির্বাচন আগে হওয়ায় সেখানে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। সারজিস আলম বলেন, “স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি পর্যালোচনা, দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে আঞ্চলিক সমন্বয় সভা করা হচ্ছে। এসব সভায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনি কৌশল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা সব রকমের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চাই।”

এদিকে এনসিপির এক পৃথক নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ের কোনো কমিটিতে ‘রানিং স্টুডেন্ট’ রাখা যাবে না। তারা এনসিপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তিতে কাজ করবেন। এছাড়া ৩০ বছরের কম বয়সি কাউকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। স্থানীয়ভাবে পরিচিত, গ্রহণযোগ্য, সৎ, দেশপ্রেমিক, সচ্ছল ও সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, মহানগর ও জেলা কমিটি হবে ১০১ সদস্যের, উপজেলা, পৌরসভা ও থানা কমিটি হবে ৭১ সদস্যের, ইউনিয়ন কমিটি ৫১ সদস্যের এবং ওয়ার্ড কমিটি হবে ৩১ সদস্যের।

সিটি নির্বাচনে এককভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে না এনসিপি। ১১ দলীয় জোটের অন্য সদস্যদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে দলটি।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করলেও দলের পূর্ববর্তী কার্যক্রম, প্রার্থীর যোগ্যতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার বিচারে ভালো ফল করবে। প্রতীকবিহীন নির্বাচনে কোনো বিশেষ দল বা মার্কাকেন্দ্রিক আনুগত্য প্রকাশ পাবে না। এতে স্থানীয় রাজনীতিতে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি হবে। বিএনপি ও জামায়াতের মতো দুই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপরীতে এনসিপি প্রার্থীরা ভালো ফল করবে।”

দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার মনে করেন, ভোটাররা এনসিপিকে একটি স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে দেখতে চান। সেই স্বতন্ত্র বিবেচনাবোধ থেকেই সুইং ভোটগুলো এনসিপির দিকে আসবে। তার মতে, বিএনপি ও জামায়াত মূলত তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক ভোটই পাবে, কিন্তু এনসিপি সাংগঠনিক ভোটের পাশাপাশি সুইং ভোটও পাবে। এই হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে এনসিপি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।