দুই দশক আগের একটি অস্ত্র মামলায় দণ্ডিত মো. আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন, অথচ নামের মিল থাকায় তাঁর পরিবর্তে মো. আলমাস নামের এক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়ে এক বছর ধরে কারাগারে বন্দি রয়েছেন। দণ্ডিত ব্যক্তি মো. আলমাছ ১০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন, কিন্তু কারাগারে থাকা আলমাস ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন।
নিজের পরিচয় ভুলভাবে শনাক্ত করার কারণে গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটছেন উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেন মো. আলমাস। গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে একটি রুল জারি করেন। আদালত কারাবন্দি আলমাস এবং দণ্ডিত ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ের জন্য তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তাঁর তত্ত্বাবধানে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে এই অনুসন্ধান বা তদন্ত পরিচালনা করতে বলা হয় এবং নির্দেশনার ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। সেই নির্দেশনার প্রেক্ষিতেই আদালতে প্রতিবেদন জমা পড়ে।
আদালতে দাখিল করা অনুসন্ধান প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস এবং মিরপুর থানার অস্ত্র মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত মো. আলমাছ দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গ্রেপ্তার মো. আলমাস (পিতা–শেখ খলিল, মাতা–রশনারা/রাসনারা বেগম, গ্রাম–সুন্দরীপাড়া, ডাকঘর–কুসুমহাটি, থানা–দোহার, জেলা–ঢাকা) ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। অন্যদিকে, পলাতক মো. আলমাছ (পিতা–মো. খলিলুর রহমান/খলিল আহম্মেদ/মো. আবুল খায়ের (খলিল), মাতা–সালমা আক্তার, গ্রাম–পূর্ব ধোয়াইর, ডাকঘর–দক্ষিণ বাহ্রা, ইউনিয়ন-নয়াবাড়ী, খানা–দোহার, জেলা–ঢাকা) হলেন প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি, যিনি বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের আজকের কার্যতালিকায় রিটটি ওঠে। রাষ্ট্রপক্ষে নিয়োজিত সহকারী অ্যার্টনি জেনারেল মহিউদ্দীন মো. হানিফ জানিয়েছেন, আদালত আগামী রোববার এই বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে ভুল ব্যক্তি গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস সপরিবারে ২০০৭ সালের আগে দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন ব্রাহা গ্রামে থাকতেন। অন্যদিকে, প্রকৃত আসামির গ্রাম পূর্ব ধোয়াইরও একই ডাকঘরের অধীনে। ডাকঘরের নাম ব্যবহার করে ঠিকানা দেওয়ার প্রচলিত নিয়মের কারণে দুজনের ঠিকানা এক বলে মনে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুজনের বাবার নামের মধ্যে যথেষ্ট মিল ছিল। প্রকৃত আসামির বাবার নাম মো. খলিলুর রহমান/খলিল আহম্মেদ/মো. আবুল খায়ের (খলিল), আর গ্রেপ্তার ব্যক্তির বাবার নাম শেখ খলিল। এই সাদৃশ্য পরিচয় শনাক্তকরণে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
তৃতীয়ত, ২০০২ সালের অস্ত্র মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত মো. আলমাছের ঠিকানার ক্ষেত্রে একটি ভুল ঘটেছিল। নথিতে ‘পূর্ব ধোয়াইর’-এর পরিবর্তে ভুলক্রমে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ লেখা হয়, যা পরবর্তী সময়ে এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও অপরিবর্তিত থাকে।
উল্লেখ্য, ‘নামের মিলে ১০ মাস ধরে কারাগারে, প্রকৃত আসামি কে তদন্তের নির্দেশ’ শিরোনামে মুক্তকণ্ঠতে গত ৪ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে জানানো হয়েছিল, দুজনেরই নাম মো. আলমাছ এবং বাবার নামেও আংশিক মিল থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ২২ বছর আগের এক অস্ত্র মামলায় মো. আলমাছ নামের এক ব্যক্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড পান এবং সেই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতেই ভুলবশত আলমাসকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মিরপুর থানায় মো. আলমাছ (২৪) ও মো. নাজমুল আলম মামুনের (২২) বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হয়। ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ রায়ে মো. আলমাছকে (বাবা মো. খলিল আহমেদ, গ্রাম দক্ষিণ বাহ্রা, দোহার, ঢাকা) ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। রায়ে তাঁর বর্তমান ঠিকানা হিসেবে আহমেদনগর, পাইকপাড়া, মিরপুর উল্লেখ করা হয়। অপর আসামি নাজমুল খালাস পান।
জানা গেছে, রায় ঘোষণার সময় আলমাছ পলাতক ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। ২০২৪ সালের ২০ মার্চের পরোয়ানার ভিত্তিতে পুলিশ গত বছরের ৫ নভেম্বর আলমাসকে (বাবা শেখ খলিল) সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে আদালতে হাজির করে, যেখান থেকে তিনি কারাগারে প্রেরিত হন।
হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তর থেকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর প্রতিবেদনে বলা হয়, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে প্রকৃত আসামি মো. আলমাছ এবং গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের পিতৃপরিচয় মেলে না। প্রকৃত আসামির পিতা খলিলুর রহমান/মো. আবুল খায়ের (খলিল), আর গ্রেপ্তার ব্যক্তির পিতা শেখ খলিল। এমনকি তাঁদের পিতামহদের নামও ভিন্ন; একজনের পিতামহ শেখ শহর আলী এবং অন্যজনের শেখ নওয়াব আলী। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কোনো মিল নেই। প্রকৃত মো. আলমাছ তিন বোনের একমাত্র ভাই, আর গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের দুই ভাই ও দুই বোন রয়েছে। অর্থাৎ, একই নামের আড়ালে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বংশের পরিচয় ছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘ঠিকানার গরমিল আসলে একটি লেখার ভুল’। মিরপুর থানার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের ঠিকানা ছিল ‘সাং-পূর্ব ধোয়াইর, থানা-দোহার, জেলা-ঢাকা’, কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া আলমাসের পরিবার ২০০৭ সালের আগে বাহ্রায় বাস করত। দুটি গ্রামই একই ডাকঘরের অধীনে হওয়ায় ঠিকানা ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ হয়ে যায়। তবে এটি স্পষ্ট যে আলমাসের গ্রাম বর্তমানে সুন্দরীপাড়া এবং আগে বাহ্রা ছিল, অন্যদিকে প্রকৃত আসামির গ্রাম সব সময়ই ‘পূর্ব ধোয়াইর’ ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বয়সের হিসেবেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০০২ সালে সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের বয়স ছিল ২৪ বছর, সেই হিসেবে ২০২৬ সালে তাঁর বয়স হবে প্রায় ৪৮। অথচ গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের জন্ম ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর, যার ফলে বর্তমানে তাঁর বয়স ৪১ বছর এবং ২০০২ সালে তিনি ছিলেন মাত্র ১৭ বছরের। এই সাত বছরের ব্যবধান উপেক্ষা করার মতো নয়।
জীবনযাত্রার ধরনেও অমিল পাওয়া গেছে। মূল আসামি মিরপুরের পাইকপাড়ায় থাকতেন এবং তাঁর কোনো নির্দিষ্ট পেশার কথা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস বাহ্রা ও সুন্দরীপাড়ায় কৃষিকাজ এবং ইলেকট্রিক কাজ করে জীবন অতিবাহিত করেছেন। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, প্রায় ৯ বছর আগে পুলিশ একবার এ বিষয়ে খোঁজ নিতে এলে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা জানিয়েছিলেন যে প্রকৃত আসামি মো. আলমাস নন, বরং প্রকৃত আসামি মো. আলমাছের বাড়ি পূর্ব ধোয়াইরে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ভুল পরিচয়ের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে অনেক আগে থেকেই সুপরিচিত ছিল।