বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট বা বাজার কারসাজি সাধারণ মানুষের জন্য এক চরম সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেলেও, রাসুল (সা.) ও রাশেদুন খলিফাদের যুগে বাজার নিয়ন্ত্রণের যে অভাবনীয় ও ভারসাম্যপূর্ণ আইনি কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তা বর্তমান বিশ্বের জন্য এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত।
ইসলামি অর্থনীতি মূলত মুক্তবাজার নীতির সমর্থক। তবে জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্র কীভাবে বাজারের ওপর যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে, সাহাবিদের যুগে তার চমৎকার প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। সাহাবিদের সময়ের বাজারদর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
ইসলামি অর্থনীতির মূল কথা হলো, বাজারে পণ্যের দাম নির্ধারিত হবে স্বাভাবিক সরবরাহ ও চাহিদার ভিত্তিতে। যদি বাজারে পণ্যের ঘাটতি দেখা দেয় এবং প্রাকৃতিকভাবেই দাম বৃদ্ধি পায়, তবে রাষ্ট্র বলপ্রয়োগ করে ব্যবসায়ীদের লোকসানে বাধ্য করবে না।
একবার মদিনায় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, দ্রব্যমূল্য অনেক বেড়ে গেছে, আপনি আমাদের জন্য একটি দাম নির্ধারণ করে দিন।’
নবীজি (সা.) এই অনুরোধে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহই মূল্যনির্ধারক; তিনিই রিজিক সংকুচিত করেন, তিনিই প্রশস্ত করেন..।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫১)
এর অর্থ হলো, স্বাভাবিক বাজারপ্রবাহে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ইসলামে অনুমোদিত নয়। তবে স্বাভাবিক মূল্যে হস্তক্ষেপ না করলেও বাজারে যেন কোনো ধরনের প্রতারণা না ঘটে, সে লক্ষ্যে হজরত ওমর (রা.) তাঁর খেলাফতকালে ‘হিসবাহ’ নিয়োগ দেন, যাকে বর্তমান সময়ের বাজার তদারকি ব্যবস্থার সাথে তুলনা করা যায়।
হজরত ওমর (রা.) নিজেই হাতে চাবুক নিয়ে মদিনার বাজারে টহল দিতেন এবং পণ্যের গুণগত মান, ওজন ও পরিমাপ যাচাই করতেন। এমনকি তিনি মদিনার বাজারের জন্য নারী সাহাবি শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.)-কে বাজার পরিদর্শক (মুহতাসিব) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, ‘মুহতাসিবের দায়িত্ব হলো বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং ওজনে কম দেওয়া বা ধোঁকাবাজি কঠোর হাতে দমন করা।’ (আহমদ ইবনে তাইমিয়া, আল-হিসবাহ ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ২৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৬)
সাহাবিদের যুগে বাজার নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কঠোর আইন ছিল মজুতদারির (ইহতিকার) বিরুদ্ধে। অসাধু ব্যবসায়ীরা যখন দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য গুদামে আটকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করত, তখন রাষ্ট্র তা বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা রাখত।
রাসুল (সা.) এই বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘পাপী ছাড়া অন্য কেউ মজুতদারি করে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০৫)
হজরত ওমর (রা.) মদিনার বাজারে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেউ যদি আমাদের বাজারে মজুতদারি করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে, তবে সে আমাদের আশ্রয়ের বাইরে।’ (বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস: ১১০০৪)
যদি মানুষের প্রয়োজন এমন কোনো পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়, যা কিছু নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীর কাছেই আছে এবং তারা ন্যায্যমূল্যের চেয়ে বেশি দাম ছাড়া তা বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে রাষ্ট্রপ্রধান তাদের সেই পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করবেন; এটিই হলো ইনসাফ।
প্রাচীন যুগেও বর্তমানের মতো দালালদের দৌরাত্ম্য ছিল। কৃষকেরা পণ্য নিয়ে শহরে আসার পথে দালালরা কম দামে তা কিনে নিয়ে বাজারে চড়া দামে বিক্রি করত। ইসলাম এই প্রক্রিয়াকে নিষিদ্ধ করেছে। সাহাবিদের যুগে নিয়ম ছিল, কৃষকের পণ্য সরাসরি মূল বাজারে প্রবেশ করবে এবং কৃষক বাজারের প্রকৃত দাম জানতে পারবে। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা বাণিজ্য-কাফেলার সঙ্গে (শহরের বাইরে) অগ্রগামী হয়ে সাক্ষাৎ করে পণ্য কিনে নিয়ো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৫০)
এই আইনের ফলে উৎপাদক যেমন ন্যায্যমূল্য পেতেন, তেমনি ভোক্তারাও দালালের কারসাজি থেকে রক্ষা পেতেন।
মহানবী (সা.) স্বাভাবিক অবস্থায় মূল্যনির্ধারণ করতে নিষেধ করলেও, যদি বাজারের গুটিকয়েক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়িয়ে দেয়, তবে রাষ্ট্র জনস্বার্থে বলপ্রয়োগ করে দাম নির্ধারণ (তাসয়ির) করে দিতে পারে।
হানাফি ও হাম্বলি ফিকহের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, যখন ব্যবসায়ীরা জুলুম শুরু করে, তখন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া ওয়াজিব (আবশ্যক)। (আল-মারগিনানি, আল-হিদায়া শারহু বিদায়াতিল মুবতাদি , ৪/৩৭৭, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৫)
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, ‘যদি মানুষের প্রয়োজন এমন কোনো পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়, যা কিছু নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীর কাছেই আছে এবং তারা ন্যায্যমূল্যের চেয়ে বেশি দাম ছাড়া তা বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে রাষ্ট্রপ্রধান তাদের সেই পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য করবেন; এটিই হলো ইনসাফ।’ (ইবনে তাইমিয়া, আল-হিসবাহ ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৩৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৬)
পরিশেষে বলা যায়, সাহাবিদের যুগের বাজার ব্যবস্থাপনা ছিল ব্যবসায়ীদের জন্য স্বাধীন এবং সাধারণ মানুষের জন্য শতভাগ সুরক্ষিত। সেখানে ব্যবসায়ীদের ন্যায্য লাভের অধিকার যেমন ছিল, তেমনি মজুতদার ও দালালদের সিন্ডিকেট ভেঙে ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি বিদ্যমান ছিল।