রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় মীরবাগ কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধের জেরে কলেজ অধ্যক্ষকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয়েছে, কাঙ্ক্ষিত পদটি না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে বিএনপি নেতারা অধ্যক্ষকে তার চেয়ার থেকে টেনে তুলে মারধর করেন। ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে ভুক্তভোগী কলেজ অধ্যক্ষ আ কা মো. জয়নুল আবেদীন এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন কাউনিয়া উপজেলার কুর্শা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলতাফ হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক ফজলুসহ দলটির প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন নেতাকর্মী।

প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ২ নভেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করেন এবং তার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করেন। একপর্যায়ে সভাপতি আলতাফ হোসেনের নির্দেশে কামাল নামের এক বিএনপি কর্মী চেয়ারে বসে থাকা অধ্যক্ষকে টেনে তুলে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেন। এসময় প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য শিক্ষক ও কর্মচারীরা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, মীরবাগ কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি মো. সেকেন্দার আলীর পদত্যাগের পর গত ১ নভেম্বর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক নাজিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে কুর্শা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমানকে সভাপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এই খবরটি জানাজানি হলে কাঙ্ক্ষিত পদটি না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলতাফ হোসেন। এর পরদিন তিনি ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক ফজলুসহ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে অধ্যক্ষের কক্ষে যান এবং একপর্যায়ে এই হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়।

এই ঘটনার বিষয়ে কুর্শা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং মীরবাগ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মাইদুল ইসলাম বলেন, “গত ২৭ তারিখ সাবেক সভাপতি পদত্যাগ করার পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নতুন সভাপতি হিসেবে মিজানুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোন প্রক্রিয়ায় তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো তা জানতে ইউনিয়ন বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা অধ্যক্ষ স্যারের কক্ষে যান। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে এক তরুণ অধ্যক্ষ স্যারকে রুম থেকে বের করার উদ্দেশ্যে চেয়ার থেকে তুলে ধাক্কা দেয়। আমরা শিক্ষকরা স্যারকে উদ্ধার করে সোফায় বসাই এবং ওই তরুণকে বের করে দেওয়া হয়।”

অন্যদিকে, ভুক্তভোগী অধ্যক্ষ আ কা মো. জয়নুল আবেদীন অভিযোগ করে বলেন, “আলতাফ হোসেন ও ফজলুর নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জন নেতাকর্মী হঠাৎ আমার কক্ষে ঢুকে জানতে চান মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন আমি চেয়ারে বসে আছি। এরপর আলতাফের নির্দেশে সন্ত্রাসী কামাল আমাকে চেয়ার থেকে তুলে আছাড় মারে। পরে আমি পুলিশকে অবহিত করি। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রেজুলেশন করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।”

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুর্শা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলতাফ হোসেন। তার দাবি, “এইচএসসি পরীক্ষার ফল এত খারাপ (২৯১ জনের মধ্যে মাত্র ৬৪ জন পাস) হওয়ার কারণ জানতে আমরা অধ্যক্ষের কাছে গিয়েছিলাম। সেখানে পরিবেশ সৌহার্দপূর্ণই ছিল। কিন্তু অধ্যক্ষের পাশে থাকা বাবু নামে একজন আক্রমণাত্মক হয়ে তারেক রহমানকে নিয়ে গালিগালাজ করে। আমাদের দলের এক কর্মী তাকে ধরতে গেলে ধাক্কাধাক্কির সৃষ্টি হয় এবং তা অধ্যক্ষের গায়েও লাগে। অধ্যক্ষকে কেউ ইচ্ছা করে চেয়ার থেকে তোলে বা ধাক্কা দেয়নি।”

ঘটনার বিষয়ে জানতে কুর্শা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক ফজলুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাদল কুমার রায় জানান, ওই কলেজের কমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ চলছিল। হট্টগোলের খবর পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল, তবে তারা বিষয়টিকে শিক্ষাসংক্রান্ত ও অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেওয়ার কথা জানান। এ কারণে পুলিশ তাদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেয়। তবে এ পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি বলে তিনি জানান।