বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে পঞ্চম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন রাশিদা তালিব। দেশটির ইতিহাসে তিনি একমাত্র ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখলেন।

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে মিশিগানের ১২তম কংগ্রেস আসন থেকে জয়ী হয়েছেন রাশিদা। নির্বাচনে তিনি ৭২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী জেমস হুপার পেয়েছেন মাত্র ২৪ শতাংশের কিছু বেশি ভোট।

মার্কিন কংগ্রেসে ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ে সবচেয়ে সোচ্চার আইনপ্রণেতাদের একজন রাশিদা তালিব। ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি ইতিহাস গড়েন। সেই বছর কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারী সদস্যের একজন ছিলেন তিনি, অন্যজন ছিলেন ইলহান ওমর।

গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত রাশিদা। তাঁর এই সাহসী অবস্থানের কারণে তাঁকে অনেক সময় সহকর্মীদের তিরস্কারের শিকার হতে হয়েছে।

রাশিদার শৈশব কেটেছে আরবি ভাষায় কথা বলে। ইংরেজি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ভাষা। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনা করতে গিয়ে অনেক সময় তাঁকে মা-বাবার ভূমিকা পালন করতে হয়েছে।

একজন স্বাধীনচেতা ও আপসহীন নারী হিসেবে পরিচিত রাশিদা তালিব। নিজের ভাষায় তিনি বলেন, ‘সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা একজন মা।’ রাশিদার নির্বাচনে অংশগ্রহণের মূল প্রেরণা ছিল তাঁর দুই ছেলে। এই বিষয়ে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, “আমি আমার দুই ছেলের জন্য নির্বাচন করছি, যাঁদের মধ্যে তাদের মুসলিম পরিচিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।”

বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী রাশিদা তালিব মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। দরিদ্র ও খেটে খাওয়া এক অভিবাসী ফিলিস্তিনি পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা-মা উভয়েই ফিলিস্তিন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন। নিজের এই পরিচয় নিয়ে রাশিদা অত্যন্ত গর্বিত।

মুসলিম দেশগুলোর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করাসহ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে গৃহীত কিছু বিতর্কিত নীতির বিরোধিতা করার জন্যই তিনি কংগ্রেস নির্বাচনে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান রাশিদা।

২০১৮ সালে প্রথমবার কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এবিসি টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “ইতিহাস তৈরির জন্য আমি নির্বাচন করিনি। আমি অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য নির্বাচন করেছি। আমাদের ছেলেদের জন্য করেছি, যাঁদের মনে তাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তাঁরা বুঝতে পারছেন না তাঁদের অবস্থান কোথায়। আমি কখনোই দূরে দাঁড়িয়ে দেখার মানুষ নই।”

ডেট্রয়েটের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রাশিদা। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার চলাকালীন রিপাবলিকানদের একটি নির্বাচনী সভায় ঢুকে তিনি সবার সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। সেই সময় তাঁকে জোরপূর্বক সভা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।

রাশিদা হারবি এলাবেদ ১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই ডেট্রয়েটের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হারবি এলাবেদ এবং মা ফাতিমা দুজনেই অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তাঁর বাবা পূর্ব জেরুজালেমে জন্মগ্রহণ করে নিকারাগুয়ায় যান এবং সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তাঁর মা এসেছিলেন ফিলিস্তিনের একটি ছোট শহর থেকে।

পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তাঁর বাবা-মা দুজনই কঠোর পরিশ্রম করতেন। তাঁরা দুজনই ফোর্ড মোটর কোম্পানির ফ্ল্যাট রক অ্যাসেম্বলি কারখানায় কর্মী ছিলেন। রাশিদাকে শৈশবে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হতে হয়েছে।

ফিলিস্তিনি-মার্কিন পরিচয় নিয়ে গর্বিত রাশিদা ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি শপথ অনুষ্ঠানে বিশেষ পোশাক পরিধান করেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল ১৭৩৪ সালে ইংরেজিতে অনূদিত পবিত্র কোরআনের একটি কপি এবং পরনে ছিল ঐতিহ্যবাহী নকশা করা ফিলিস্তিনি পোশাক ‘থোব’।

পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন রাশিদা। ১৯৯৮ সালে ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং ২০০৪ সালে ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

১৯৯৮ সালে ফায়েজ তালিবকে বিয়ে করেন রাশিদা। তাঁদের দুই ছেলে রয়েছে। তবে ২০১৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদের পরও তিনি স্বামীর পদবিটি নিজের নামের সাথে রেখে দিয়েছেন।

আইন পড়াশোনা শেষ করে মিশিগানের ডিয়ারবর্নে যান রাশিদা। সেখানে তিনি আরব কমিউনিটি সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল সার্ভিসেসে (অ্যাকসেস) কাজ শুরু করেন। আরবদের অধিকার নিয়ে কাজ করা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর পেছনে পারিবারিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের বড় ভূমিকা ছিল। ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি বৈষম্য ও দুর্ভোগ তিনি খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারতেন।

শৈশবে রাশিদাকেও বিদ্রূপ ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এমনকি মুদিদোকানে হিজাব পরার কারণে তাঁর মাকে হেনস্তার শিকার হতে দেখেছেন তিনি।

২০০৮ সালে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভার নির্বাচনে দলীয় প্রাইমারিতে ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন রাশিদা। পরবর্তীতে সাধারণ নির্বাচনেও জয়লাভ করে তিনি মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় দায়িত্ব পালন করা প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।

অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নিজ এলাকার মানুষের জন্য নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর উদ্যোগে শুরু হয় ‘উই হ্যাভ আ রাইট টু ব্রিদ’ (আমাদের শ্বাস নেওয়ার অধিকার আছে) প্রচারাভিযান। এর লক্ষ্য ছিল আবাসিক এলাকার সড়ক থেকে দূষণ ছড়ানো ভারী ট্রাক সরিয়ে নেওয়া।

ডেট্রয়েট নদীর তীরের কালো ধুলা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ জানালে রাশিদা তদন্তের দাবি জানান। যদিও মিশিগান পরিবেশগত মান বিভাগ জানিয়েছিল যে সবকিছু ঠিক আছে এবং তদন্তের প্রয়োজন নেই। তবে রাশিদা নিজেই ধুলার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং দেখা যায় ওই ধুলায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে। এরপর তাঁর চাপে নদীর তীর পরিষ্কার করতে বাধ্য হয় অঙ্গরাজ্য সরকার।

মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় তিন মেয়াদ দায়িত্ব পালনের পর তিনি সুগার ল সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল জাস্টিসে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এটি একটি উদারপন্থী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যার লক্ষ্য নিম্ন আয়ের ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন। সেখানে কাজ করার সময় তিনি ম্যারাথন অয়েল শোধনাগারের দূষণ কমানোর উদ্যোগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করেন।

২০১৮ সালে মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের একটি আসন খালি হলে রাশিদা প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে তিনি শুরুতে খুব শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন না এবং অনেকের কাছে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ মনে হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এক হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে জয় পান তিনি এবং সাধারণ নির্বাচনে জিতে কংগ্রেস আসনটি নিশ্চিত করেন।

২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি শপথ অনুষ্ঠানে তিনি আবারও সেই ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি পোশাক ‘থোব’ এবং ১৭৩৪ সালের ইংরেজিতে অনূদিত পবিত্র কোরআনের কপি সাথে রেখেছিলেন।

প্রথমবার কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৯ সালে ইসরায়েল সরকার রাশিদা তালিবের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিবিসি জানিয়েছে, ইলহান ওমরের ওপরও সে সময় একই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। এছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিদাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, দ্য নিউ আরব, ন্যাশনাল উইমেন্স হিস্ট্রি মিউজিয়াম