নির্বাচনের প্রাক্কালে ডেমোক্রেটিক পার্টি একই সময়ে দুটি বিপরীতমুখী খবরের সম্মুখীন হয়েছে। একদিকে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে তাদের জন্য আশার আলো দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে মিশিগান অঙ্গরাজ্যে নিজ দলের এক নেত্রীর রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থনের ঘোষণা সেই ইতিবাচক খবরের সঙ্গে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

আজ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এই নির্বাচনের ফলেই নির্ধারিত হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির হাতেই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, নাকি তা ডেমোক্রেটিক পার্টির দখলে যাবে।

এবারের এই লড়াইয়ে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের হাতে ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের হাতে ২১৪টি আসন রয়েছে। অন্যদিকে, সিনেটে রিপাবলিকানদের দখলে ৫৩টি আসন এবং দুজন স্বতন্ত্র সিনেটরের সমর্থনসহ ডেমোক্র্যাটদের হাতে রয়েছে ৪৫টি আসন। উল্লেখ্য, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রতিনিধি পরিষদে ২১৮টি এবং সিনেটে ৫১টি আসন প্রয়োজন হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মূল লড়াই হবে প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় ৪০টি আসনে এবং সিনেটের ১০ থেকে ১২টি আসনে।

গত রোববার নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথভাবে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা গেছে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাতটি অঙ্গরাজ্যেই সংখ্যার হিসেবে এগিয়ে আছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদের প্রতি সমর্থন ৫৩ শতাংশ, যেখানে রিপাবলিকান মাইক রজার্সের সমর্থন ৪২ শতাংশ। টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেট জেমস টালারিকোর প্রতি সমর্থন ৫০ শতাংশ এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনের সমর্থন ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ, এই দুই অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের ব্যবধান যথাক্রমে ১১ ও ৭ শতাংশ পয়েন্ট।

মেইন অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের চেয়ে ছয় পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন। ওহাইও ও কানসাসে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের ব্যবধান পাঁচ পয়েন্ট করে। তবে আলাস্কায় এই ব্যবধান মাত্র দুই পয়েন্ট এবং আইওয়ায় এক পয়েন্ট। শেষোক্ত দুই অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান জরিপের ত্রুটিসীমার (মার্জিন অব এরর) মধ্যে রয়েছে; বিশেষ করে আইওয়ার লড়াই কার্যত সমানে সমান। ফলে সাতটি অঙ্গরাজ্যেই ডেমোক্র্যাটদের জয় নিশ্চিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে এই সাতটি অঙ্গরাজ্যের কোথাও তারা পিছিয়ে নেই, যা তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বিষয়।

তবে এই আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির মধ্যেই মিশিগান থেকে এসেছে এক বিব্রতকর খবরের। ডেমোক্রেটিক পার্টির বাছাইপর্বে এল-সাইয়েদের কাছে পরাজিত কংগ্রেস সদস্য হেইলি স্টিভেন্স রোববার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানিয়েছেন। ডেট্রয়েটের একটি গির্জায় রজার্সের সঙ্গে উপস্থিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন তিনি। নির্বাচনের একেবারে শেষ মুহূর্তে প্রতিপক্ষের শিবিরে এমন ফাটল রিপাবলিকানদের জন্য এক অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক উপহার হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সুযোগটি লুফে নিয়েছেন এবং স্টিভেন্সের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে তাঁকে রিপাবলিকান পার্টিতে স্বাগত জানানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

এই বিরোধের মূলে রয়েছে ইসরায়েল ও গাজা ইস্যুতে ডেমোক্রেটিক পার্টির দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য। স্টিভেন্স ইসরায়েলের জোরালো সমর্থক, অন্যদিকে আল-সাইয়েদ গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তার কঠোর সমালোচক। বাছাইপর্বের সময়েও এই প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিলক্ষিত হয়েছে।

সাম্প্রতিক এই বিরোধের সূত্রপাত একটি বাইরের রাজনৈতিক সংগঠনের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। ওই বিজ্ঞাপনে ইসরায়েলকে মার্কিন আর্থিক সহায়তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের সম্পর্ক দেখানো হয়। স্টিভেন্স এই বিজ্ঞাপনটিকে ইহুদিবিদ্বেষমূলক আখ্যা দিয়ে আল-সাইয়েদকে এর নিন্দা করতে বলেন। আল-সাইয়েদের প্রচারশিবির দাবি করে, বিজ্ঞাপনটির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। পরবর্তীতে আল-সাইয়েদ বিজ্ঞাপনের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেও সরাসরি তার নিন্দা করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

পরিকল্পনা ছিল, রোববার ডেট্রয়েটের একটি গির্জায় ডেমোক্রেটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের উপস্থিতিতে স্টিভেন্স ও আল-সাইয়েদ একসঙ্গে হাজির হয়ে দলীয় ঐক্যের বার্তা দেবেন। তবে সেই আয়োজন ভেস্তে যায়। ডেমোক্রেটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা ডেবি ডিঙ্গেল সিএনএনকে বলেছেন, “বিরোধটি প্রচারের মূল বিষয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছিল বলে তিনিই স্টিভেন্সকে অনুষ্ঠানে যেতে ‘না’ করেছিলেন।” ফলে ঘটনাটিকে কেবল একটি আমন্ত্রণ প্রত্যাহারের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে পেছনের দীর্ঘ বিরোধটি আড়ালে পড়ে যায়।

স্টিভেন্সের এই সিদ্ধান্তে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মিশিগান ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কার্টিস হার্টেল অভিযোগ করেছেন, রজার্সের পক্ষে প্রচারে নেমে স্টিভেন্স নিজের মূল্যবোধই পরিত্যাগ করেছেন। সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমারও আল-সাইয়েদের প্রতি দলের ঐক্যবদ্ধ সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। এমনকি স্টিভেন্সের দীর্ঘদিনের চিফ অব স্টাফসহ তাঁর দলের কর্মীরাও আল-সাইয়েদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন।

তবে এই ঘটনার একটি উল্টো প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা গেছে। আল-সাইয়েদের প্রচারশিবিরের দাবি, স্টিভেন্সের ঘোষণার পর মাত্র চার ঘণ্টায় তারা ১২ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে। যদিও এটি ভোটের ফলের পূর্বাভাস নয়, তবে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ঘটনা তাঁর সমর্থকদের আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ কি মিশিগানের আসনটি ডেমোক্র্যাটদের হাতছাড়া করতে পারে? এই মুহূর্তে নিশ্চিত উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে বাছাইপর্বে স্টিভেন্সের সমর্থকরা তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হতে পারেন। বিশেষ করে ইসরায়েল প্রশ্নে আল-সাইয়েদকে নিয়ে অস্বস্তিতে থাকা ভোটারদের কাছে তাঁর এই ঘোষণা বাড়তি গুরুত্ব পেতে পারে।

নিঃসন্দেহে মিশিগানের এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি তাৎক্ষণিক সমস্যা তৈরি করেছে। নির্বাচনের শেষ সময়ে যখন তারা জীবনযাত্রার ব্যয় ও ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে চান, তখন নিজেদের বিভেদের ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে তাদের। জনমত জরিপ তাদের আশাবাদী করার সুযোগ দিলেও, সেই সম্ভাবনাকে জয়ে রূপ দিতে হলে দলীয় বিরোধ মেটানোর পাশাপাশি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসাই হবে সবচেয়ে জরুরি কাজ।