নির্বাচনী জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা আর চূড়ান্ত জয়লাভ করা এক বিষয় নয়। অধিকাংশ জাতীয় জরিপে ডেমোক্র্যাটরা বেশ বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও, এই ইতিবাচক সংকেত পেয়েই বিজয়োল্লাসে মেতে উঠতে রাজি নন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা। তাঁদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা—দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস থাকা প্রয়োজন, তবে তা যেন কখনোই আত্মতুষ্টিতে পরিণত না হয়।

২১ অক্টোবর বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, জরিপপ্রতিষ্ঠান নেট সিলভারের নির্বাচনী পূর্বাভাসের হিসেবে ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯৪ শতাংশ এবং সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার সম্ভাবনা ৭৭ শতাংশ। ওই প্রতিবেদনে দুই কক্ষের সম্ভাব্য আসনবণ্টনের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেখানে ডেমোক্রেটিক পার্টি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ২৩৯টি আসন পেতে পারে এবং রিপাবলিকান পার্টি পেতে পারে ১৯৬টি আসন। অন্যদিকে, উচ্চকক্ষ সিনেটে ডেমোক্রেটদের সম্ভাব্য আসন ৫২টি এবং রিপাবলিকানদের ৪৮টি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য অনুধাবন করা প্রয়োজন। জয়ের সম্ভাবনা ৭৭ শতাংশ হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ডেমোক্রেটরা ৭৭ শতাংশ ভোট পাবেন। এর প্রকৃত অর্থ হলো, গাণিতিক মডেলের হিসাবে তাঁদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি, তবে হারের সম্ভাবনাও প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। এই সম্ভাবনাকে মোটেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো কিছু নয়।

ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান কেন মার্টিন সমর্থকদের এখনই বিজয়োল্লাসে মেতে উঠতে নিষেধ করেছেন। গত শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনের এখনো ১১ দিন বাকি এই মুহূর্তে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সুযোগ নেই। তিনি আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু আত্মতুষ্ট নন। ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনী প্রচার কমিটির মুখপাত্র ভিয়েট শেলডনও বলেছেন, রিপাবলিকানদের বিপুল অর্থ ব্যয়ের মুখে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সর্বশক্তিতে প্রচার চালাতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে পেশাদার জনমত জরিপগুলো একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। তবে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ব্যবহার করলেই যে ভুলের সম্ভাবনা শূন্য হয়ে যায়, তা নয়। প্রতিটি জরিপে সাধারণত ভুলের একটি নির্দিষ্ট সীমা বা ‘মার্জিন অব এরর’ উল্লেখ থাকে, যা মূলত নির্বাচনের অনিশ্চয়তাকে নির্দেশ করে। জনমত জরিপ মূলত একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের জনমতের খণ্ডচিত্র মাত্র। এই জরিপ কেবল বলে দেয় সেই মুহূর্তে জনমত কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে; নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে, তা বলে দেয় না। শেষ পর্যন্ত কারা ভোট দেবেন আর কারা দেবেন না, সেটিই ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করে, জনমত জরিপের হিসাব নয়।

সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী জরিপে রিপাবলিকানদের সমর্থন প্রকৃত ফলাফলের তুলনায় কম দেখা গেছে। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে যে, ট্রাম্পের কিছু সমর্থক জরিপে অংশ নিতে তুলনামূলকভাবে কম আগ্রহী। তাঁদের যথাযথভাবে হিসাবে আনতে না পারলে জরিপে ভুল থাকার সম্ভাবনা থাকে।

নির্বাচনের এখনো কয়েকদিন বাকি এই মুহূর্তে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সুযোগ নেই।

আরেকটি বহুল আলোচিত ব্যাখ্যা হলো ‘লাজুক’ বা ‘শাই’ ভোটার। লোকলজ্জা কিংবা সামাজিক অগ্রহণযোগ্যতার ভয়ে অনেক ভোটার নিজের প্রকৃত পছন্দ গোপন করতে পারেন। উত্তর দেওয়ার এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পক্ষপাত’। পক্ষপাতদুষ্টতার এই প্রকাশ নিয়ে আলোচনায় রয়েছে ‘ব্র্যাডলি প্রভাব’ বা ব্র্যাডলি এফেক্ট কথাটি। এই নামের উৎস লস অ্যাঞ্জেলেসের কৃষ্ণাঙ্গ মেয়র টম ব্র্যাডলি। ১৯৮২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনে জরিপে এগিয়ে থেকেও তিনি শ্বেতাঙ্গ রিপাবলিকান প্রার্থী জর্জ ডিউকমেজিয়ানের কাছে হেরে যান। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জরিপকারীদের কাছে শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা ব্র্যাডলিকে ভোট দেবেন এমন কথা বললেও ভোটের সময় পুরোনো পক্ষপাতের কারণে কালো মানুষটির বদলে শ্বেতকায় মানুষটিকেই ভোট দিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। তবে নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের মূল লড়াই সীমাবদ্ধ কিছু নির্দিষ্ট আসনে।

১৯৮৯ সালে নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে ডেভিড ডিঙ্কিন্সের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠেছিল। নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে জরিপে তিনি শ্বেতকায় রুডি জুলিয়ানির চেয়ে ১৮ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি জিতেছিলেন মাত্র ২ পয়েন্টের ব্যবধানে। জরিপের সঙ্গে ফলাফলের এই বিশাল ব্যবধান ভোটারদের গোপন বর্ণবাদী মনোভাবের ফল, এমন সিদ্ধান্ত টানা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক নয়।

ট্রাম্পকে নিয়েও একই রকম পক্ষপাতদুষ্টতা কাজ করে। তাঁর খোলামেলা ইমিগ্র্যান্ট বিরোধী এবং ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থানের কারণে অনেক ভোটারের মনে অস্বস্তি রয়েছে, যদিও মনে মনে তাঁরা এই অবস্থানকে সমর্থন করেন। এমন ভোটাররা যদি জনমত জরিপকারীদের ‘রিপাবলিকানদের ভোট দেব না’ বলে শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকান বাক্সেই ভোট দেন, তবে তাতে অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।

এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের মূল লড়াই সীমিতসংখ্যক আসনে। প্রতিনিধি পরিষদে প্রায় ৪০টি এবং সিনেটে মোটামুটি ১০ থেকে ১২টি আসন বিশেষভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।

এর কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভক্তির ফলে অধিকাংশ আসনই নীল ও লাল বা ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—এভাবে আগেভাগেই চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। এবারের নির্বাচনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তার কারণে এর আগে ‘নিরাপদ’ হিসেবে বিবেচিত অনেক রিপাবলিকান আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্রেটরা। জাতীয়ভাবে ডেমোক্রেটরা এগিয়ে থাকলেও তা প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে তাঁদের জয় নিশ্চিত করে না। কয়েকটি রাজ্যে জরিপ যদি দুই-তিন পয়েন্ট ভুল করে, তবে একাধিক আসনের ফল একসঙ্গে বদলে যেতে পারে। শেষ সময়ে ভোটারদের উৎসাহ ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাত্রা এই কম-বেশির প্রভাব ফেলতে পারে।

সিনেটে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রয়োজন অন্তত ৫১টি আসন। বর্তমান অবস্থান থেকে তাঁদের কমপক্ষে চারটি আসন বাড়াতে হবে। ফলে নিজেদের আসন ধরে রাখার পাশাপাশি কয়েকটি রিপাবলিকান আসনও ছিনিয়ে আনতে হবে, যা খুব সহজ কাজ নয়।

বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে রিপাবলিকান পার্টি ও তাদের সমর্থক সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটিগুলো বিপুল অর্থ নিয়ে মাঠে নেমেছে। তাঁদের মূল নজর টেক্সাস, মিশিগান, মেইন ও ওহাইওর সিনেট আসনের ওপর। টেক্সাস ও ওহাইওতে তাঁরা নিজেদের আসন রক্ষার চেষ্টা করছেন এবং মিশিগানে লক্ষ্য ডেমোক্রেটদের আসন দখল করা। এই প্রতিরক্ষা ও আক্রমণের সমন্বয়ই হলো তাঁদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার কৌশল।