নির্বাচনের তারিখ যত এগিয়ে আসছে, ততই তীব্র হচ্ছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান ও বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের মধ্যকার লড়াই। জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটদের সুবিধা কমে আসার কথা বলা হলেও সর্বশেষ তথ্যগুলো তেমন ইঙ্গিত দিচ্ছে না, যদিও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনে ব্যবধান কিছুটা কমেছে। তবে বিপুল নির্বাচনী তহবিলের জোরে নেতিবাচক প্রচারণার ওপর জোর দিচ্ছে রিপাবলিকানরা। নিজ দলের সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে নির্বাচনী প্রচারণার হাল ধরেছেন খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে সব ক্ষেত্রে এই কৌশলের ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে না। জনমত জরিপের তথ্যানুসারে তাঁর কাজের প্রতি সমর্থন মাত্র ৩১ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সর্বনিম্ন হার।

অধিকাংশ পূর্বাভাসে ডেমোক্র্যাটরাই এখনো এগিয়ে রয়েছেন। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য নির্বাচনী পূর্বাভাস বিশেষজ্ঞ নেট সিলভারের প্রস্তুত মডেল অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ডেমোক্র্যাটদের ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ। এই মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে ২৪টি এবং সিনেটে ৫টি আসন বাড়তে পারে তাদের।

তবে মনে রাখতে হবে এগুলো সম্ভাবনার হিসাব, চূড়ান্ত ফলাফল নয়। ২০ অক্টোবরের সিলভার বুলেটিন আপডেটে দেখা গেছে, সম্ভাব্য ভোটারদের জন্য সমন্বয় করা জাতীয় কংগ্রেসনাল ব্যালটে ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান বেড়ে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট হয়েছে। এই নির্বাচনী চক্রে সমন্বিত হিসাবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য এটিই সর্বোচ্চ ব্যবধান।

নির্বাচনী লড়াইয়ে রিপাবলিকানদের পিছু হটার প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। নর্থ ক্যারোলাইনা ও জর্জিয়ার সিনেট নির্বাচনে নিজেদের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত জেনে রিপাবলিকানরা বিজ্ঞাপনের বাজেট কমিয়ে দিয়েছে অথবা স্থগিত করেছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই দুই অঙ্গরাজ্যতেই ট্রাম্প বেশ বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন। নর্থ ক্যারোলাইনায় সিনেট লিডারশিপ ফান্ড তাদের বিজ্ঞাপন স্থগিত করে কানসাসের সিনেট আসনের জন্য অর্থ সরিয়ে নিয়েছে।

কানসাসের এই আসনে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শাল পুনর্নির্বাচনের লড়াই করছেন। তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ২৫ বছরের পেশাগত জীবনে চিকিৎসা ফি দিতে না পারার অপরাধে কয়েক শ নিম্ন আয়ের রোগীকে জেলে পাঠিয়েছেন তিনি। এই খবর প্রকাশের পর থেকেই তিনি বিপদে পড়েছেন। প্রবল ট্রাম্প-ভক্ত হিসেবে পরিচিত কানসাসে নিজ দলের এই প্রার্থীকে বাঁচাতে ব্যক্তিগতভাবে অনেক চেষ্টা করছেন ট্রাম্প, তবে তাতেও শেষরক্ষা হবে বলে মনে হচ্ছে না।

প্রতিনিধি পরিষদের বেশ কিছু আসনেও রিপাবলিকান দল ও তাদের সমর্থকরা ব্যয়ের অগ্রাধিকার বদলেছেন। পলিটিকো জানিয়েছে, একাধিক রিপাবলিকান নেতা স্বীকার করেছেন যে, এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা অসম্ভব। এমনকি বর্তমান স্পিকার মাইক জনসন পর্যন্ত ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ক্ষমতার হাতবদল হলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে ব্যবসায় মন দেবেন।

তবে রিপাবলিকানদের এখনই গণ হিসেবে ফেলে দেওয়া ঠিক হবে না। ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশাল নির্বাচনী তহবিল। দলীয় তহবিলের পাশাপাশি প্রার্থীদের সমর্থনে গঠিত সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা সুপার প্যাকগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এপির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাস থেকে ইলন মাস্ক একাই রিপাবলিকানপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে ২৭৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি দিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেও ব্যক্তিগত নির্বাচনী তহবিল থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার খরচের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

প্রতিনিধি পরিষদের আশা ছেড়ে দিলেও সিনেট হাতছাড়া করতে রাজি নন রিপাবলিকানরা। বর্তমানে তাদের সব মনোযোগ মিশিগান, টেক্সাস ও মেইনের সিনেট প্রার্থীদের ওপর। মিশিগানে প্রগতিশীল ও কট্টর ইসরায়েলবিরোধী প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদকে পরাজিত করতে তারা ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে পারে।

অন্যদিকে টেক্সাসে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জেমস টালারিকোর বিপরীতে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী কেন প্যাক্সটনকে জেতাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ইলন মাস্ক একাই দেড় শ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। মেইনের পরিস্থিতিও একই রকম, যেখানে মধ্যপন্থী সিনেটর সুসান কলিন্সকে জিতিয়ে আনতে রিপাবলিকান দাতারা বিপুল অর্থ ব্যয় শুরু করেছেন।

এই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক বিজ্ঞাপনে। এল-সাইয়েদকে একজন ‘টেররিস্ট-সমর্থক’ এবং টালারিকোকে ‘গুপ্ত-সমকামী বা লিঙ্গান্তরিত’ বলে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জনমত জরিপে ইঙ্গিত মিলেছে যে, এর ফলে রিপাবলিকান প্রার্থীরা কিছুটা ব্যবধান কমাতে পেরেছেন। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত আক্রমণ হানার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি এল-সাইয়েদকে ‘একজন সন্ত্রাসী যে আমেরিকাকে ঘৃণা করে’ এবং টালারিকোকে ‘টালাফ্রিকো’ নামে অভিহিত করেছেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের শাসনকালের ওপর এক ধরনের গণভোট বা রেফারেন্ডাম হিসেবে বিবেচিত হয়। এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয়, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং ইরান যুদ্ধ ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। ডেমোক্র্যাটরা এই সমস্যাগুলোকে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য বা ‘অ্যাফোর্ডাবিলিটি’র সাথে যুক্ত করে প্রচার চালাচ্ছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের দুর্নীতির প্রশ্ন। ফক্স নিউজের সাম্প্রতিক এক জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের ৮৮ শতাংশ সরকারি দুর্নীতি নিয়ে অত্যন্ত বা খুব উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন।

“রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষ বা এমনকি একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেও সেটি তাঁর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে”—এই কথাটি ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব ভালো করেই জানেন। প্রতিনিধি পরিষদ হাতছাড়া হলে তিনি নতুন তদন্ত এবং অভিশংসনের মুখে পড়তে পারেন। তাই নিজ দলের প্রার্থীদের প্রচারে তিনি মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন, যাতে সমর্থকদের উজ্জীবিত করা যায়।

তবে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জনমত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৭১ শতাংশ মানুষ মনে করেন দেশ ভুল পথে চলছে এবং এর জন্য দায়ী ট্রাম্প। তাঁর নির্বাচনী র‍্যালিতে এখন আর আগের মতো ভিড় জমে না। এমনকি কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী নিজেদের রাজ্যে ট্রাম্প এলেও তাঁকে সযত্নে এড়িয়ে চলছেন। কেন প্যাক্সটন অভিযোগ করেছেন যে, তাঁর পক্ষে ট্রাম্পের প্রচারণায় ভালোর চেয়ে মন্দই বেশি হচ্ছে। অন্যদিকে মেইনের সুসান কলিন্স স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি চান না ট্রাম্প তাঁর রাজ্যে প্রচারণায় আসুন।