ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঘুষের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে কেরল সরকার। কংগ্রেস শাসিত কেরল সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা আইনজ্ঞদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর গত বুধবার এই নির্দেশ প্রদান করেন। অভিযোগ করা হয়েছে যে, ২০০৬ সালে কেরল সরকারের পূর্তসচিব হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন এক সড়ক প্রকল্পের বকেয়া বিল পরিশোধের বিনিময়ে তিনি দুই কোটি রুপি ঘুষ দাবি করেছিলেন।

প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, যে ব্যক্তির কাছে এই অর্থের দাবি জানানো হয়েছিল, তিনি ছিলেন মালয়েশিয়ার একটি সংস্থার কর্মকর্তা। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি আত্মহত্যা করেন। তাঁর লেখা সুইসাইড নোটে ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে জ্ঞানেশ কুমারের নাম স্পষ্টভাবে লেখা ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ঘুষ না দিলে পূর্ত দপ্তর বকেয়া টাকা আটকে রাখবে। উল্লেখ্য, ওই নির্দিষ্ট সড়ক প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল সেই মালয়েশিয়ান সংস্থাটি।

গত মাসে প্রথমবার এই অভিযোগটি সামনে আসে। রাজ্যের কংগ্রেস নেতা এম বেনুগোপাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ দায়ের করেন। বেনুগোপাল জানান, অভিযোগকারী প্রকৌশলীটি পরবর্তীতে আত্মহত্যা করেছিলেন এবং তাঁর সুইসাইড নোটে ঘুষ চাওয়ার কথা স্পষ্টভাবে লেখা ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো চিঠিতে বেনুগোপাল উল্লেখ করেন, তৎকালীন পারিপার্শ্বিক চাপের কারণে ওই সময়ে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তিনি কেন্দ্রীয় সরকারে বদলি হয়ে যান।

দ্বিতীয় অভিযোগটি উত্থাপন করেছেন সজন নামের একজন ঠিকাদার। তিনি তাঁর অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, ওই সংস্থার প্রকৌশলী এবং মালয়েশিয়ার নাগরিক লি সি বিনের কাছে জ্ঞানেশ কুমার দুই কোটি রুপি ঘুষ চেয়েছিলেন। মূলত সংস্থার বকেয়া ১৭ কোটি রুপির বিল মেটানোর শর্তে এই অর্থের দাবি জানানো হয়েছিল। ঠিকাদার সজনের দাবি, লি সি বিন নিজেও তাঁকে ঘুষ চাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে সুইসাইড নোটে সেই অভিযোগ লিখে যান।

বুধবার কেরল সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, আইনি পরামর্শ গ্রহণের পর মন্ত্রণালয় এই অভিযোগটি তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দিয়েছে। এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কেরল সরকারের ‘ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি–করাপশন ব্যুরো’-কে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, পুরোনো অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযোগকারী সজন নতুন করে মামলা করেছেন। তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

জ্ঞানেশ কুমার ১৯৮৮ সালের কেরল ক্যাডারের একজন আইএএস কর্মকর্তা। ২০০৬ সালে তিনি কেরল সরকারের পূর্তসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, যখন রাজ্যে বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ ও মেরামতের কাজ চলছিল। ভারত ও মালয়েশিয়ার যৌথ উদ্যোগে গঠিত পিএটি–আইবিএল নামক একটি সংস্থা সড়ক নির্মাণের একটি বড় প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়েছিল। সজনের দাবি, তিনি ওই প্রকল্পে নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, লি সি বিন তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, ১৭ কোটি রুপি বকেয়া পাওনা মেটাতে জ্ঞানেশ তাঁর কাছে দুই কোটি রুপি ঘুষ চেয়েছিলেন এবং অর্থ না দিলে বিল পরিশোধ করা হবে না বলে হুমকি দিয়েছিলেন। এই মানসিক চাপই লি সি বিনকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয় বলে দাবি করা হয়েছে।

সজনের আরও দাবি, ওই সুইসাইড নোটে জ্ঞানেশ কুমারের পাশাপাশি পূর্ত দপ্তরের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম ছিল, তবে সেই নোটটি প্রকাশ্যে আসেনি। ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এই বিষয়ে তদন্ত চললেও পরবর্তীতে তা আর এগোয়নি। এখন ভিজিল্যান্স দপ্তর নতুন করে তদন্ত শুরু করবে। কংগ্রেস নেতা বেনুগোপালের অভিযোগ, আগের তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রভাব খাটানো হয়েছিল। ঠিকাদার সজনও জানান, পূর্ববর্তী তদন্তের সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। তাঁর প্রস্তাব, নতুন তদন্তকারী দলের সামনে লি সি বিনের পরিবারের সদস্যদের হাজির করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, সিইসি ও দুই কমিশনারের (ইসি) নিয়োগ সংক্রান্ত নতুন আইনের একটি বিশেষ ধারা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাখ্যা তলব করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ২০২৩ সালে প্রণীত আইনের ১৬ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, কমিশনারদের কোনো কাজ নিয়ে তাঁদের জীবদ্দশায় কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা করা যাবে না। অর্থাৎ, তাঁরা আজীবন সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্ত থাকবেন।

এই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাটিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছেন আরজেডির লোকসভা সদস্য মনোজ ঝা, আইনজীবী ও সমাজকর্মী অরুণ কুমার আগরওয়াল এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এডিআর)। তাঁরা এই আজীবন রক্ষাকবচের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, এই ধারাটি অসাংবিধানিক। তাঁদের মতে, দেশের রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপাল এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরও এমন কোনো আজীবন রক্ষাকবচ নেই। রাষ্ট্রপতির রক্ষাকবচ কেবল তাঁর মেয়াদের সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকে। তাই এই ধারাটি বাতিল করার আবেদন জানানো হয়েছে।

আবেদনকারীদের বক্তব্য, এই ধারায় কোনো ব্যতিক্রম রাখা হয়নি। ফলে অসৎ উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করা হলেও কিংবা এখতিয়ার বহির্ভূত কিছু করলেও তাঁরা এই সুরক্ষা কবচের আওতায় থাকবেন। তাঁদের মতে, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি হলেও তার অর্থ এই নয় যে, তাঁরা আইনি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকবেন।

বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন যাতে শাসক দলের ইশারায় কাজ করতে পারে এবং সেই কাজের জন্য আজীবন যাতে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা না যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই আইন করা হয়েছে। তাঁদের আরও দাবি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে লোকসভা ও রাজ্যসভা থেকে ১৪৬ জন বিরোধী সদস্যকে বরখাস্ত করে নরেন্দ্র মোদি সরকার এই আইন পাস করিয়েছে। ২১ ডিসেম্বর বিলটি যখন লোকসভায় কণ্ঠভোটে পাস হয়, তখন বিরোধী বেঞ্চগুলো খালি ছিল।

সুপ্রিম কোর্ট ওই আইনের ১৬ নম্বর ধারার ওপর কোনো স্থগিতাদেশ দেননি। তবে সর্বোচ্চ আদালত গত বুধবার কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ পাঠিয়ে জবাব তলব করেছে। আগামী ১৮ ডিসেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।