বিপদ যখন আসে, সবদিক দিয়ে ধেয়ে আসে—এই প্রবাদটি যেন বর্তমানে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হচ্ছে। তাঁর অপসারণের দাবির ব্যাপ্তি ও বহর দিন দিন কেবল বাড়ছেই না, বরং তাঁর বিরুদ্ধে পুরোনো মামলার বন্ধ হয়ে যাওয়া ফাইলগুলোও নতুন করে খোলা হচ্ছে। নানা দিক থেকে সংকট এখন জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে ধরেছে।
গান্ধী জয়ন্তীর দিন থেকে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা আজ রোববারও অব্যাহত রয়েছে। গত শুক্রবার শিবাজি পার্কে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ‘জেল ভরো’ অভিযান পরিচালনা করেছিল। সেই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন ঠাকরে ভাইয়েরা—শিবসেনার উদ্ধব এবং মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার (এমএনএস) নেতা রাজ ঠাকরে। আজ সেই ‘ঠাকরে ব্রাদার্স’ মুম্বাইয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে এক বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দেন। লক্ষাধিক মানুষের এই মিছিলে মুম্বাইয়ের জনজীবন কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায় এবং যান চলাচল পুরোপুরি থমকে যায়।
এই মিছিলের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিরাট গর্জনা মোর্চা’। দক্ষিণ মুম্বাইয়ের মেট্রো সিনেমা জংশন থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি শেষ হয় বৃহন্মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের সামনে। এই মিছিলে অংশ নেন মুম্বাইয়ের কংগ্রেস নেতা বালাসাহেব থোরাট, বিজয় ওয়ারেত্তিওয়ার, এনসিপি (শরদ) নেতা জয়ন্ত পাটিল, শশীকান্ত শিন্ডেসহ আরও অনেক রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মিছিলে জাতীয় পতাকা এবং সরকার ও জ্ঞানেশবিরোধী পোস্টার থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পতাকা দেখা যায়নি। ঠাকরে ভাইয়েরা বলেন, “এই মুহূর্তে দেশের মানুষের দাবি একটাই, জ্ঞানেশ হটিয়ে গোটা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করা হোক। ভবিষ্যতের সব ভোট হোক ব্যালট মারফত।” তাঁদের অভিযোগ, জ্ঞানেশের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাঁরা আরও বলেন, “২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির বিপর্যয়ের মাত্র পাঁচ মাস পর এই কমিশন মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটের আগে ৬০ লাখ ভোটারের নাম তুলে বিজেপিকে ক্ষমতা দখলে সাহায্য করেছিল। তারাই এবার এসআইআরের নামে ভোটার তালিকা থেকে দুই কোটি ভোটারের নাম কেটে দিয়েছে।”
দেশজুড়ে জ্ঞানেশ হটাও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি তাঁকে আইনি জালে জড়ানোর চেষ্টাও চলছে। কংগ্রেস-শাসিত কেরল সরকার তাঁর বিরুদ্ধে একটি পুরোনো মামলার তদন্ত নতুন করে শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে। মামলাটি অন্তত কুড়ি বছরের পুরোনো, যা ২০০৬ সালের মধ্যভাগের ঘটনা। সে সময় কেরলমে বামপন্থীরা ক্ষমতায় ছিলেন। রাজ্যের একটি দীর্ঘ রাস্তা তৈরির বরাত পেয়েছিল ‘পাতি–বেল’ নামের একটি নির্মাণ সংস্থা। এটি ছিল ভারত ও মালয়েশিয়ার একটি যৌথ উদ্যোগ, যেখানে মালয়েশিয়ান সংস্থা ‘পাতি’ এবং কেরলমের ভগীরথ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড (বেল) অংশ নিয়েছিল। অভিযোগ করা হয়, ২৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার কাজ শেষ হওয়া সত্ত্বেও সংস্থাটির পাওনা টাকার একটি অংশ আটকে রাখা হয়েছিল। ওই প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন মালয়েশিয়ার নাগরিক লি সি বিন। টাকা আদায়ের চেষ্টারত অবস্থায় তিনি আত্মহত্যা করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর সুইসাইড নোটে তৎকালীন কেরল সরকারের পূর্তসচিব জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ আনা হয়েছিল। তৎকালীন বাম সরকার ঘটনাটি তদন্তের জন্য ভিজিল্যান্স বিভাগের দায়িত্ব দিলেও কিছুদিনের মধ্যেই সেই তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি কংগ্রেস নেতা মালয়ানকিজু বেনুগোপাল সরকারের কাছে অভিযোগ জানান যে, বাম আমলে ওই তদন্ত ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল পথে চালিত করা হয়েছিল এবং মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর এই অভিযোগের ভিত্তিতেই কেরল সরকারের পূর্তমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা নতুন করে তদন্ত শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে যে, বাম আমলে এই প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব খাটানো হয়েছিল কি না। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরোর পরিচালকের ওপর। কেরল সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পূর্ত দপ্তরের সচিব থাকাকালীন সরকারি ঠিকাদারির বরাত দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক আচরণের অভিযোগ ছিল, কিন্তু প্রভাবশালী হওয়ার কারণে তদন্ত থেমে গিয়েছিল। মালয়েশিয়ান ইঞ্জিনিয়ারের আত্মহত্যার পর জ্ঞানেশ ডেপুটেশনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চলে যান।
কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি বর্তমান আইনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং অন্য দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির জন্য নির্দিষ্ট রক্ষাকবচ রয়েছে। নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা করা যাবে না। তবে ২০২৩ সালে মোদি সরকারের তৈরি এই আইন ২০০৬ সালের ঘটনার তদন্তের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। কেরল সরকারের দাবি, কুড়ি বছর পুরোনো ঘটনার তদন্ত শুরুর পথে কোনো আইনি বাধা নেই। এই নির্দেশ সম্পর্কে জ্ঞানেশ কুমার বা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ১৯৯৮ ব্যাচের আইএএস অফিসার জ্ঞানেশ কুমারের বিড়ম্বনা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যা কমার কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।