ভারতীয় সংসদের লোকসভা ও রাজ্যসভার ভেতরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব গৃহীত না হলেও, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আয়োজনে তিনি 'গণ অভিশংসিত' হয়েছেন। শনিবার কংগ্রেস সভাপতি ও রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের সরকারি বাসভবনের প্রশস্ত লনে এই বিশেষ ‘গণ অভিশংসনপর্ব’ অনুষ্ঠিত হয়।
এই প্রক্রিয়ায় জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মোট ৬টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। ‘গণ অভিশংসন’ প্রস্তাবটি পাঠ করার সময় মল্লিকার্জুন খাড়গে স্পষ্টভাবে জানান যে, সিইসির সঙ্গে তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। তাঁরা কেবল এটি পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন কি না। খাড়গের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার তা করেননি। তিনি আরও বলেন, “সংবিধান প্রণেতারা গণতন্ত্র মজবুত করতে যা করে গিয়েছিলেন, নরেন্দ্র মোদি–অমিত শাহর হয়ে জ্ঞানেশ তা শেষ করে দিয়েছেন।”
খাড়গে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উত্থাপন করেন তা হলো: ১. সিইসি হিসেবে নিরপেক্ষতার পথ অনুসরণ না করে তিনি শাসক দলের হয়ে ভোট চুরির চক্রান্ত করেছেন। ২. এই চক্রান্তের অংশ হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। ৩. সংসদের তোয়াক্কা না করে বেআইনিভাবে তিনি ‘ফর্ম ৬’ পরিবর্তন করেছেন। ৪. ইসিআইনেটের মাধ্যমে ভোটার তালিকার কেন্দ্রীকরণ করেছেন। ৫. নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের হওয়া সত্ত্বেও অন্য দুই কমিশনারকে অন্ধকারে রেখে তিনি একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তা চাপিয়ে দিয়েছেন। এবং ৬. নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেছেন।
প্রস্তাবটি উত্থাপন করে খাড়গে উল্লেখ করেন, নিরপেক্ষভাবে কাজ না করা এবং বিজেপিকে নির্বাচনে সুবিধা করে দেওয়ার অপরাধে জ্ঞানেশ কুমারকে সিইসি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ৭ মাস আগে ১৯৩ জন সদস্য সংসদের উভয় কক্ষে অভিশংসন নোটিশ জমা দিয়েছিলেন। তবে সেই নোটিশ বিবেচনা না করেই খারিজ করে দেওয়া হয়। খাড়গে আরও অভিযোগ করেন, ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিজেপি একের পর এক ষড়যন্ত্র করে চলেছে। তারা অর্থপ্রয়োগ করে সংসদ সদস্য কিনেছে, বিরোধী দল ভাঙিয়েছে এবং বিরোধীদের সরকার ফেলে দিয়েছে। নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে তহবিলের বিস্তার ঘটিয়েছে এবং ইডি ও সিবিআই-এর মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে ভোট চুরি। খাড়গের দাবি, এই জ্ঞানেশদের রক্ষাকবচ দিতে বিজেপি সংসদ থেকে শতাধিক সদস্যকে বহিষ্কার করে এমন আইন পাস করেছে, যার ক্ষমতা দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধান বিচারপতিরও নেই।
সাড়ে চার ঘণ্টা ব্যাপী এই ‘গণ অভিশংসন’ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন নেতা জ্ঞানেশ কুমারের তীব্র সমালোচনা করেন। তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেন, বেছে বেছে মুসলমানদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং জ্ঞানেশ গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ৭১ শতাংশই মুসলমান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, নির্বাচন কমিশনের ভোট চুরির কারণে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনটাই অবৈধ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “জ্ঞানেশ কুমার যা করেছেন তাতে তাঁকে শুধু ‘অভিশংসন’ করলেই হবে না। তিনি দেশবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। দেশের বিরোধিতা করেছেন। তিনি যা করেছেন তা দেশদ্রোহ। দেশদ্রোহের শাস্তিও তাঁকে পেতে হবে।” রাহুল গান্ধী আরও দাবি করেন, তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে যা জ্ঞানেশকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন, আজ অথবা কাল তাঁকে পদ ছাড়তেই হবে, আর বিজেপি যদি তাঁকে নিয়ে জেদ ধরে থাকে তবে তাদের চরিত্র আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে।
রাহুল গান্ধীর মতে, দেশের যুব, ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষক সবাই বুঝতে পেরেছেন যে ভোট চুরি হলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তাই এই আন্দোলন এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর নয়, বরং এটি একটি গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়ার শেষে স্পিকার হিসেবে মীরা কুমার প্রস্তাবটি ভোটে দেন এবং উপস্থিত সবাই হাত তুলে তার পক্ষে মত দেন। মীরা কুমার জানান, পাঁচ বছর লোকসভার স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও কোনো প্রস্তাব এভাবে সর্বসম্মতিতে এবং বিনা বিরোধিতায় পাস হতে তিনি দেখেননি। সংসদের রীতি অনুযায়ী জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে জ্ঞানেশের ‘গণ অভিশংসন’ প্রক্রিয়াটি শেষ হয়। তবে অনুষ্ঠান শেষেও ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়’ স্লোগান শোনা যায়।
উল্লেখ্য, অভিশংসিত করা বলতে বোঝায় সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অপরাধের দায়ে সংসদের বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো উচ্চপদস্থ সাংবিধানিক কর্মকর্তাকে অপসারণ করা।
বিরোধীদের এই অভিনব উদ্যোগকে কটাক্ষ করেছে বিজেপি। দলের মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বলেন, সারা পৃথিবী বুঝে গেছে রাহুল গান্ধীর জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে। ওই উপগ্রহ আর উড়বে না। নকল সংসদে নকল প্রধানমন্ত্রী হয়েই তাঁকে সারা জীবন কাটাতে হবে।
প্রথমে এই ‘গণ অভিশংসন’ অনুষ্ঠানটি শুক্রবার করার কথা থাকলেও প্রবল বৃষ্টির কারণে তা সম্ভব হয়নি। শনিবার দুপুরে দেখা যায়, খাড়গের বাসভবনের লনটিকে পুরনো সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলের আদলে সাজানো হয়েছে। স্পিকারের আসনে বসেছিলেন ইউপিএ আমলের স্পিকার ও বিহারের কংগ্রেস নেত্রী মীরা কুমার। তাঁর সামনে সেন্ট্রাল হলের মতোই টেবিল ও বেঞ্চের সারি এবং পেছনে চেয়ারের সারি সাজানো ছিল। সংসদ ভবনের মতো এখানেও নেতারা টেবিল চাপড়ে বক্তব্য সমর্থন করেন। এই জমায়েতে বিরোধী সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, ছাত্র-যুব নেতা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যা আক্ষরিক অর্থেই এই মঞ্চকে ‘গণ অভিশংসন’–এর আসরে পরিণত করেছিল।