পোশাক শ্রমিকদের বিভিন্ন আন্দোলনে অর্থ জোগান দেওয়া এবং জনবল দিয়ে সহায়তা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ীসহ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সবার ব্যাংক হিসাব জব্দের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

অভিযোগ উঠেছে যে, এই তালিকায় বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং সাবেক এমপি ও ব্যবসায়ীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি শিল্প গ্রুপের মালিকদের নাম রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) দেশের সকল ব্যাংকে এই সংক্রান্ত একটি জরুরি নির্দেশনা প্রেরণ করেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে সংশ্লিষ্টদের তালিকা পাঠিয়ে তাদের যাবতীয় লেনদেন স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এনবিআরের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি জানান, বিশেষ একটি কারণে সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ ৩৪ জন ব্যক্তি এবং ৩৪টি পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করছে।

তবে এনবিআরের আরও একাধিক সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, জব্দ করার তালিকায় আরও অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত হতে পারে। এই সংখ্যাটি শতাধিক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, তালিকায় থাকা অনেকের ব্যাংক হিসাব দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা অন্য কোনো সংস্থার আবেদনের প্রেক্ষিতে আগে থেকেই জব্দ করা রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, "প্রতিদিনই তালিকা হালনাগাদ হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ তথ্য পরে জানানো হবে।"

তালিকায় যাদের নাম উঠে এসেছে

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় রয়েছেন সিপাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।

এছাড়া এই তালিকায় এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, রেনেসাঁ গ্রুপের মালিক ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং হামিদ গ্রুপের মালিক ও সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু রয়েছেন।

তালিকায় আরও রয়েছেন ফেবিয়ান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছালাম, নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরী, অ্যাক্সিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের পরিচালক জাহিদ আহমেদ টুলু, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম মোশাররফ হোসেন এবং গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুমা খাতুন লিপা।

পাশাপাশি মিরপুর এলাকায় পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থ জোগানোর অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগনে আলিফ মোল্লা, জাহাঙ্গীর আলমের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মী কামাল গাজী ও শুভ।

সম্প্রতি সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, "পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। এ কাজে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত আছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।"