টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নির্দিষ্ট করা টাঙ্গাইল বিসিক শিল্পনগরীর বাণিজ্যিক এলাকায় নিয়মবহির্ভূতভাবে সিসা তৈরির কার্যক্রম চলছে। ‘মেসার্স ব্রাদার্স মেটাল’ নামক ওই কারখানা থেকে নির্গত ঘন কালো বিষাক্ত ধোঁয়ায় মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে চারপাশের পরিবেশ। পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর কারখানাটি বন্ধের নোটিশ দিলেও তা তোয়াক্কা না করে অব্যাহত রয়েছে এর উৎপাদন কার্যক্রম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কারখানার ভেতরে শ্রমিকেরা কাজ করছেন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে, যেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের কোনো চিহ্ন নেই। এমনকি সেখানে শিশু শ্রমিকদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। কারখানা থেকে অনবরত কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে, অথচ সেখানে নেই কোনো কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কিংবা বর্জ্য শোধনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিষাক্ত ধোঁয়া এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে আশপাশের পরিবেশ বিষিয়ে উঠছে। ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্য থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা বাড়ছে। স্থানীয় শ্রমিক মো. আব্দুল হালিম বলেন, “কারখানা থেকে বের হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া আমাদের নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে। এতে অনেকের শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।”

পরিবেশের বিপর্যয়ের কথা জানান কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “কারখানার ধোঁয়ার কারণে এলাকার ক্ষেতের ফসল ও গাছপালার ফলন কমে যাচ্ছে। আগে গাছে গাছে মৌমাছি চাক বাঁধত, কিন্তু এখন বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে মৌমাছিও আর আগের মতো চাক বাঁধে না। এতে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দিন-রাত কারখানার কালো ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছি না। একদিকে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি; অন্যদিকে ফসল, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমরা অবিলম্বে এই কারখানা বন্ধের দাবি জানাই।”

বিসিক শিল্পনগরী কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোকন জানান, কারখানাটিতে কোনো নিয়ম-কানুন মানা হচ্ছে না এবং এভাবে সিসা উৎপাদন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “কারখানাটিতে কোনো নিয়মনীতি না মেনেই সিসা উৎপাদন করা হচ্ছে। এখান থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। কারখানার আশপাশের গাছপালায় আগের মতো ফলন হচ্ছে না। আগে এসব গাছে প্রচুর মৌমাছি এসে চাক বাঁধত এবং মধু সংগ্রহ করত। কিন্তু এখন বিষাক্ত পরিবেশের কারণে মৌমাছিরাও আর আগের মতো চাক বাঁধে না।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কারখানাটিতে বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য অপসারণের জন্য কোনো ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) প্ল্যান্ট নেই। ফলে পুরো এলাকাবাসী স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন। খাদ্য উৎপাদন শিল্পনগরীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে অবৈধ সিসা কারখানাটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে সবার জন্য ভালো হবে বলে তিনি মনে করেন।

উল্লেখ্য, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে কারখানাটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়। তবে সেই নোটিশের পরও কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, কারখানাটিকে দ্বিতীয় দফায় নোটিশ দেওয়া হবে। এরপরও যদি নির্দেশনা অমান্য করা হয়, তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কারখানাটি বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।

অন্যদিকে, বিসিক শিল্পনগরী কর্মকর্তা ওয়াসিম সরকারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার কথা বলেন। পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিত দেন যে, কারখানাটির বিষয়ে কিছু ‘অদৃশ্য চাপ’ রয়েছে।