প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি সফর ঘিরে খুলনায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। নগরীকে বর্ণিল সাজে সজ্জিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনাগুলোতে পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে জেলা স্টেডিয়াম ও সার্কিট হাউস এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টনী স্থাপন করা হয়েছে এবং পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দিনব্যাপী সরকারি সফরে খুলনায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিকেল ৩টায় খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস (সিজন-২)’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর খুলনা মহানগরে এটিই তার প্রথম সফর।

সকাল থেকেই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার স্বার্থে জেলা স্টেডিয়ামের আশপাশের উঁচু ভবনগুলোতে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। সার্কিট হাউস থেকে জেলা স্টেডিয়াম পর্যন্ত সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে, যেখানে পরিচয়পত্র দেখিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সকাল থেকে সড়কে সাধারণ যানবাহনের উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা গেছে। দুপুর ১.৩০ টার পর কেএমপির বিশেষ শাখা থেকে নেওয়া পরিচয়পত্র দেখিয়ে সাংবাদিকদের জেলা স্টেডিয়ামে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সরকারি ভবনগুলোতে নতুন রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। নগরীর দেয়ালে দেয়ালে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ ও খানজাহান আলী (রহ.) সেতুর চিত্রকর্মে সাজানো হয়েছে পুরো নগরী। পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে খুলনাকে এক নতুন রূপে উপস্থাপন করার চেষ্টা চলছে।

তৃণমূল পর্যায়ের শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ এবং তাদের জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে খুলনা জেলা স্টেডিয়াম থেকে উদ্বোধন হচ্ছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬–২৭, সিজন-২’। দেশের ৫০৩টি উপজেলায় একযোগে শুরু হবে এই প্রতিযোগিতা।

এবারের আসরে অনলাইনে নিবন্ধন করেছে ১৬ লাখ ২৩ হাজার ২১৮ জন শিশু-কিশোর। এর মধ্যে বালক ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩ জন এবং বালিকা ৬ লাখ ৭৯ হাজার ১৩৫ জন। নিবন্ধিত খেলোয়াড়দের মধ্যে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ ছেলে এবং ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ মেয়ে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, ইউনিয়ন পর্যায়ে দল গঠনের মাধ্যমে প্রায় ১৪ লাখ প্রতিযোগী এই আসরে অংশ নেবে।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক জানিয়েছেন, দ্বিতীয় আসরে দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নে দল গঠন করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, “প্রথম আসরে নিবন্ধন ছিল প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার। এবার তা বেড়ে ১৬ লাখের বেশি হয়েছে।” আগামী বছরের মে বা জুনে জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্ব শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

এবারের আসরে মোট ১০টি খেলায় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে ফুটবলে ৯ লাখ ১৮ হাজার ৬২০ জন। এরপর অ্যাথলেটিকসে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ২১৮, ক্রিকেটে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৯১২, ব্যাডমিন্টনে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৫২৩, কাবাডিতে ১ লাখ ৯০ হাজার ৯৪৭, দাবায় ১ লাখ ৭১ হাজার ২২৯ এবং সাঁতারে ১ লাখ ৫৯ হাজার ২৯১ জন নিবন্ধন করেছেন।

এছাড়া ভলিবলে ৭৪ হাজার ৮২৯, মার্শাল আর্টে ৩১ হাজার ৯৫১ এবং টেবিল টেনিসে ২৪ হাজার ৮০৭ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। প্রথম আসরের আটটি ইভেন্টের সঙ্গে এবার ভলিবল ও টেবিল টেনিস যুক্ত করা হয়েছে। একজন প্রতিযোগী সর্বোচ্চ দুটি ইভেন্টে অংশ নিতে পারবেন।

দ্বিতীয় আসরে মেয়েদের অংশগ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আয়োজকরা। নিবন্ধিত খেলোয়াড়দের প্রায় ৪২ শতাংশই বালিকা। টেবিল টেনিসে মেয়েদের অংশগ্রহণের হার সর্বোচ্চ ৬০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ক্রিকেটে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ বাড়বে এবং পরিবারগুলো সন্তানদের মাঠে পাঠাতে উৎসাহিত হবে। তৃণমূলের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সুযোগ তৈরি করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।

প্রথম আসরের বিজয়ীদের মধ্য থেকে ৪০ জন প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে বাছাই করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৮ জন মেয়ে ও ১২ জন ছেলে। নির্বাচিত খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি উন্নত প্রশিক্ষণ ও পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আগামী জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, “নির্বাচিত খেলোয়াড়দের হারিয়ে যেতে না দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার দায়িত্ব বহন করবে।”

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে খুলনার ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। খুলনা জেলা স্টেডিয়ামের অবশিষ্ট গ্যালারি নির্মাণ, বিভাগীয় স্টেডিয়ামের উন্নয়ন এবং নিয়মিত ক্রীড়া আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, খুলনা থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি অনুযায়ী, তিনি দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে খুলনা সার্কিট হাউসে পৌঁছাবেন। সেখানে কিছু সময় বিরতির পর বিকেল ৩টায় জেলা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন। সফর শেষে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার।

জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, “প্রধানমন্ত্রী খুলনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। খুলনার উন্নয়ন ও মানুষের জীবিকা বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে তিনি মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন পরিদর্শন করেছেন, যাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস আসে।” আগামীতে এর প্রতিফলন দেখা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, “খুলনা আমাদের প্রাণের শহর। এই শহরটাকে আরও বেশি প্রাণবন্ত দেখতে চাই। আমরা শহরটাকে গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি এবং আগামীতে স্পোর্টস সিটিতে রূপান্তরিত করতে চাই।” প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে দলের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি সভা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সাংগঠনিক প্রস্তুতি চলছে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “খুলনাবাসী অধীর আগ্রহে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের অপেক্ষায় রয়েছে। মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে শহরকে শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে না, সুন্দরভাবে সাজানোও হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরীকে নতুন সাজে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে দেশবাসী খুলনার নতুন চেহারা দেখতে পারে।”

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেডিএ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনা বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা আগমন নগরবাসীর জন্য গৌরব ও আনন্দের বিষয়। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে খুলনায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। খুলনা মহানগরীকে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও আধুনিক নগরী হিসেবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী বাসযোগ্য খুলনা গড়ে তুলতে তারা বদ্ধপরিকর।” প্রধানমন্ত্রীর আগমন সফল করতে সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবির পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, “কুদির বটতলা থেকে রূপসা বাইপাস হয়ে জেলা স্টেডিয়ামমুখী পুরো পথজুড়ে খুলনাবাসীর পুষ্পবৃষ্টি ও অভিনন্দনের জোয়ার বইবে।” শৃঙ্খলা রক্ষা ও যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তোরণ-ব্যানারে শহর না ঢেকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব খুলনা গড়ার বার্তা নেতাকর্মীরা দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

খুলনা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব (ভারপ্রাপ্ত) ও জেলা পরিষদ প্রশাসক মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসর খুলনা থেকে সারাদেশে একযোগে উদ্বোধন করবেন। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ-উল্লাস দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী খুলনায় যত বেশি সফর করবেন, খুলনার উন্নয়ন তত বেশি ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি আশা করেন।

নগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ সাদী বলেন, “খুলনাবাসী অধীর আগ্রহে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের অপেক্ষায় রয়েছে। কাছ থেকে হোক কিংবা দূর থেকে, এক নজর তাঁকে দেখে মনের আকুতি পূরণ করতে চান নগরবাসী।”