জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬’ সম্পর্কে আলোচনা করা। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের আমন্ত্রণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে’র দ্বিতীয় আসরের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন।

আলোচনার গতিপ্রকৃতি যখন নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর বাইরে ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন শাখায় ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন অবচেতনভাবেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে চলে আসে—আসলে এই ‘নতুন কুঁড়ি’রা বড় হয়ে ওঠার পথটি হবে কেমন?

গতবারের তুলনায় এবার অনেক বেশি সাড়া পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তিনি জানান, আগামী ৫ নভেম্বর খুলনা স্টেডিয়ামে প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় একযোগে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে’র দ্বিতীয় আসরের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম আসরে কিশোর-কিশোরীদের নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার, যা এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ২৩ হাজারে। এর মধ্যে ৬ লাখের বেশি কিশোরী নিবন্ধন করেছেন। অর্থাৎ, এবার নিবন্ধনের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে।

১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের এই প্রতিভা অন্বেষণ প্রক্রিয়ায় গতবারের ৮টি খেলার পাশাপাশি এবার টেবিল টেনিস ও ভলিবল যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো এবারও বাছাইকৃত প্রতিভাদের মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় বিকেএসপির বিভিন্ন শাখায় ভর্তি করা হবে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ঢাকার বাইরের বিকেএসপি কেন্দ্রগুলোকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং আশা করছি, অন্য বিকেএসপিগুলোকে আমরা কীভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পারি, সেটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আপনাদের সামনে দৃশ্যমান হবে।’

বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া কিশোর-কিশোরীদের যাবতীয় খরচ সরকার বহন করবে। উল্লেখ্য, গত আসর থেকে নির্বাচিত ৩১০ জন কিশোর-কিশোরী ইতিমধ্যে সাভার বিকেএসপিতে ৪০ দিনের অনুশীলন কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘এই প্রোগ্রাম ধারাবাহিকভাবে করতে পারলে আগামী ৩–৪–৫ বছরে পাইপলাইনে অনেক নতুন খেলোয়াড় চলে আসবে।’

‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ গতবার উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু হলেও এবার তা দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন থেকে শুরু হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে উপজেলা, জেলা, বিভাগ এবং সবশেষে ফাইনাল পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। আগামী এপ্রিলের শেষ অথবা মে মাসের শুরুর দিকে ঢাকায় চূড়ান্ত পর্বের আয়োজন করা হবে।

মতবিনিময় সভায় ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি করে মাঠ তৈরির সরকারি উদ্যোগ, উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগ এবং স্থানীয় খেলাধুলায় জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তাদের ভূমিকাকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আগে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তারা জেলা পরিষদ কার্যালয়ে অফিস করলেও বর্তমানে তাঁদের কর্মস্থল জেলা স্টেডিয়ামগুলোতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে মাঠ তৈরির বিষয়ে আমিনুল হক জানান, ইতিমধ্যে ৩৫টি জেলার ৪৯৯টি ইউনিয়নে মাঠ পাওয়া গেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এই সংখ্যা এক হাজারে উন্নীত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে মাঠ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে যে অবকাঠামো ও পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ ক্রীড়াবিদ তৈরির স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সভায় বিকেএসপির সামর্থ্য নিয়েও আলোচনা হয়। অভিযোগ রয়েছে যে, গত কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমতাবস্থায় তারা ‘নতুন কুঁড়ি’দের সুষম বিকাশ ঘটাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এমনকি বিকেএসপিতে কোচ নিয়োগের ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজনদের ‘পুনর্বাসন’ করার অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব প্রশ্নের জবাবে আমিনুল হক জানান, বিষয়গুলো তাঁর অজানা নয় এবং সমস্যা সমাধানে তিনি বিকেএসপি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।

দেশের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলায় নিয়মিত খেলাধুলা না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের, যার অন্যতম প্রধান কারণ বাজেট স্বল্পতা। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তাঁদের জন্য বরাদ্দ বাজেটে বড়জোর চা-নাশতার ব্যবস্থা করা যায়। এই সংকট কাটাতে সরকার এবার একটি বিকল্প সমাধান ভেবেছে। সারা দেশের খেলাধুলার জন্য সরকার বড় অঙ্কের একটি প্রাথমিক তহবিল গঠন করবে, যা ব্যাংকে জমা থাকবে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত মুনাফা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের খেলাধুলার জন্য পৃষ্ঠপোষক সংগ্রহের চেষ্টাও করা হবে।

পরিশেষে, এই সম্ভাব্য সমাধানগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবেই ‘নতুন কুঁড়ি’রা তাদের সাফল্যের সঠিক পথ খুঁজে পাবে।