চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের অভিষেক মৌসুমেই অবিশ্বাস্য এক ইতিহাস সৃষ্টি করল ইতালিয়ান ক্লাব কোমো। সেস্ক ফ্যাব্রেগাসের নেতৃত্বাধীন এই দল এমন এক কীর্তি অর্জন করেছে, যা আধুনিক ফুটবল যুগে এই প্রতিযোগিতায় আগে কখনো দেখা যায়নি। ফরাসি ক্লাব লাঁসের মাঠেই প্রতিপক্ষের জালে ৯ বার বল পাঠিয়ে ৯-১ গোলের এক অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। এই জয়ের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড স্পর্শ করার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় অ্যাওয়ে জয়ের একক রেকর্ডটি নিজেদের করে নিয়েছে ইতালিয়ান ক্লাবটি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে ফ্রান্সের স্তাদ বোলার্ত-দেলেলিসে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বের চতুর্থ ম্যাচে মুখোমুখি হয় লাঁস ও কোমো। ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে সফরকারীরা এবং প্রথমার্ধেই তিনটি গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় নিয়ে নেয়। বিরতির পর আক্রমণের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে আরও ছয়বার গোল করে স্বাগতিকদের দিশেহারা করে দেয় কোমো। অন্যদিকে, পুরো ম্যাচে লড়াই করলেও স্বাগতিক লাঁসের পক্ষে একমাত্র গোলটি করেন রুবেন আগিলার।
ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই গোলের সূচনা করেন দুভিকাস। কর্নার থেকে আসা বলে মাক্সিমো পেরোনের সহায়তায় কাছ থেকে লক্ষ্যভেদ করেন এই গ্রিক ফরোয়ার্ড। এরপর ৩২ মিনিটে আলেক্স ভালের পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আট মিনিট আগে দুর্দান্ত এক শটে ব্যবধান ৩-০ করে দেন আর্জেন্টাইন তরুণ নিকো পাজ। প্রথমার্ধেই বড় জয়ের মজবুত ভিত গড়ে ফেলে ফ্যাব্রেগাসের দল।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার পর আক্রমণাত্মক ফুটবল অব্যাহত রাখে কোমো। বিরতির মাত্র দুই মিনিট পরেই নিকো পাজের পাস থেকে গোল করেন অধিনায়ক লুকাস দা কুনিয়া। এরপর ৫৩ মিনিটে হেড শটের মাধ্যমে পঞ্চম গোলটি করেন জার্মান ডিফেন্ডার মার্ক-অলিভার কেম্পফ।
ম্যাচের মোড় আরও ঘুরিয়ে দেন দুভিকাস। এর চার মিনিট পর নিজের তৃতীয় গোল করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের প্রথম চারটি ম্যাচেই গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়লেন এই স্ট্রাইকার। হ্যাটট্রিকের পর তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়টি। এর ফলে আর্লিং হলান্ড ও নিকোলো ত্রেসোল্ডিকে পেছনে ফেলে প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় এককভাবে শীর্ষে উঠে এসেছেন তিনি।
কোমোর গোলবন্যা থামানো যায়নি। ৬২ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে ব্যবধান ৭-০ করেন মাত্তিয়া লিবেরালি। এই গোলের পর লাঁসের জন্য ম্যাচটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ৬৫ মিনিটে রুবেন আগিলার একটি দুর্দান্ত ভলি শটে একটি গোল শোধ করলেও তা স্বাগতিকদের দুর্দশা কাটাতে পারেনি।
৬৯ মিনিটে মার্টিন বাতুরিনা করেন কোমোর অষ্টম গোল। সবশেষে যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে নবম গোলটি করেন মাত্র ১৮ বছর বয়সী মাত্তেও পাপাচ্চিওলি। কোমোর যুব একাডেমি থেকে উঠে আসা এই মিডফিল্ডার তার প্রথম ইউরোপীয় ম্যাচেই গোল করে এই ঐতিহাসিক জয়ের অংশীদার হলেন।
এই জয়ের ফলে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আট গোলের ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড স্পর্শ করল কোমো। এর আগে ২০০৭ সালে বেসিকতাসকে ৮-০ গোলে হারিয়েছিল লিভারপুল এবং ২০১৫ সালে মালমোর বিপক্ষে একই ব্যবধানে জিতেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। তবে লিভারপুল ও রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে এক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে কোমো। আগের দুটি রেকর্ড গড়া হয়েছিল নিজেদের হোম গ্রাউন্ডে, কিন্তু কোমো এই রেকর্ড গড়েছে প্রতিপক্ষের মাঠে। ফলে আধুনিক যুগে সবচেয়ে বড় অ্যাওয়ে জয়ের একক রেকর্ড এখন তাদের দখলে।
পাশাপাশি, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে প্রতিপক্ষের মাঠে এক ম্যাচে ৯ গোল করার নজির গড়া প্রথম দল হিসেবে ইতিহাস লিখল কোমো। ইউরোপিয়ান কাপের পুরোনো ইতিহাস বিবেচনা করলে ১৯৭১ সালে সাইপ্রাসের অলিম্পিয়াকোস নিকোসিয়ার মাঠে নেদারল্যান্ডসের ফেইনুর্দ ৯ গোল করেছিল।
এক ম্যাচে ৯ গোল করার বিরল কীর্তিতেও দ্বিতীয় দল হিসেবে নাম লিখাল কোমো। এর আগে ২০২৪ সালে ক্রোয়েশিয়ার দিনামো জাগরেবকে ৯-২ গোলে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে এই রেকর্ড গড়েছিল বায়ার্ন মিউনিখ।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই আসরটিই কোমোর জন্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগে প্রথম অভিজ্ঞতা। অভিষেক মৌসুমেই তারা একের পর এক চমক দিচ্ছে। প্রথম ম্যাচে আরবি লাইপজিগকে ৪-১ গোলে হারানোর পর দ্বিতীয় ম্যাচে ফেইনুর্দের মাঠে ৩-২ গোলে হেরেছিল তারা। তবে তৃতীয় ম্যাচে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৪-১ গোলে হারিয়ে পুনরায় জয়ের ধারায় ফেরে দলটি। আর এবার লাঁসের মাঠে গোলবন্যা বইয়ে দিল তারা।
চার ম্যাচে তিন জয় ও এক হারে কোমোর সংগ্রহ এখন ৯ পয়েন্ট। লিগ পর্বের অর্ধেক পথ শেষে ৩৬ দলের পয়েন্ট তালিকায় তারা চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এই চার ম্যাচে দলটির মোট গোল ১৯টি, যা ইউরোপের প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোতে প্রথম চার ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছে। এর আগে ১৯৭৬ সালে ইংলিশ ক্লাব কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্স একই সংখ্যক গোল করেছিল।
অন্যদিকে, নিজেদের মাঠে এমন শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ফরাসি কোনো ক্লাবের সবচেয়ে বড় পরাজয়ের লজ্জাজনক রেকর্ড গড়েছে লাঁস। চার ম্যাচে মাত্র তিন পয়েন্ট নিয়ে তারা তালিকার ৩৩তম স্থানে অবস্থান করছে।