দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে তাদের বর্ণিল সফর শেষ করল বিশ্বখ্যাত কে-পপ গ্রুপ বিটিএস। ‘অ্যারিরাং’ নামক তাদের ওয়ার্ল্ড ট্যুরের অংশ হিসেবে এই সফরের আওতায় পাঁচটি ভিন্ন শহরে মোট ১৪টি কনসার্ট সম্পন্ন করেছে ব্যান্ডটি। প্রতিটি অনুষ্ঠানের টিকিট আগেভাগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। সব মিলিয়ে এই কনসার্টগুলোতে মোট ৮ লাখ ৫৩ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। গত ২৮, ৩০ ও ৩১ অক্টোবর ব্রাজিলের সাও পাওলোর মোরুম্বি স্টেডিয়ামে তিনটি জমকালো কনসার্টের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা সফর শেষ করে বিটিএস।

গত ২ অক্টোবর কলম্বিয়ার বোগোতা থেকে এই মহাদেশীয় সফর শুরু হয়। সেখান থেকে পেরুর লিমা, চিলির সান্তিয়াগো এবং আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস হয়ে অবশেষে ব্রাজিলে পৌঁছায় গ্রুপটি। মঞ্চে তারা তাদের পঞ্চম অ্যালবাম ‘অ্যারিরাং’-এর গানগুলোর পাশাপাশি ‘ফেক লাভ’, ‘নট টুডে’, ‘মাইক ড্রপ’, ‘ফায়ার’, ‘আইডল’, ‘বাটার’ ও ‘ডাইনামাইট’-এর মতো বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় গানগুলো পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করে।

এবারের বিশ্ব ভ্রমণে পোশাকের ক্ষেত্রেও ছিল বিশেষ চমক। ব্রাজিলের দর্শকদের সম্মান জানাতে ফুটবল জার্সি পরে মঞ্চে হাজির হন সদস্যরা। বিশেষ করে জিন ও আরএমের মাথায় ব্রাজিলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী পালকের মুকুট দেখা গেছে।

সাও পাওলোর শেষ কনসার্টে দক্ষিণ আমেরিকার দর্শকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জে-হোপ। তিনি বলেন, “দক্ষিণ আমেরিকা আমাদের কাছে সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সফরগুলোর একটি ছিল। কারণ, এখানে আপনাদের সঙ্গে আমাদের খুব বেশি দেখা হয় না। আসার আগেই এখানে পারফর্ম করার জন্য আমরা ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিলাম। অনেক প্রত্যাশাও ছিল। আপনারা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভালোবাসা দিয়েছেন।”

ভবিষ্যতে আবারও দক্ষিণ আমেরিকায় ফিরে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন গ্রুপের সদস্যরা। শনিবার উইভার্সে সরাসরি সম্প্রচারে জিমিন বলেন, “এত দিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমরা সবাই খুব আনন্দিত ছিলাম। দক্ষিণ আমেরিকার এই সফর আমাদের কাছে দারুণ এক স্মৃতি হয়ে থাকবে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের এত মানুষ আমাদের ভালোবাসেন, বিষয়টি এখনো আমাকে বিস্মিত করে। এই স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে আমরা প্রস্তুতি নেব এবং আবার ফিরব।”

বিটিএসের জন্য এবারের সফরটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কলম্বিয়া ও আর্জেন্টিনায় এটিই ছিল গ্রুপটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ কনসার্ট। এছাড়া অভিষেকের পর এই প্রথম তারা পেরু সফর করল। অন্যদিকে চিলিতে দীর্ঘ ৯ বছর এবং ব্রাজিলে ৭ বছর পর মঞ্চে পারফর্ম করল বিটিএস।

গ্রুপটির এই সফরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শহরে ব্যাপক আয়োজন দেখা গেছে। তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাবের স্বীকৃতিস্বরূপ বোগোতা ও বুয়েনস এইরেসে বিটিএসকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সান্তিয়াগোতে সাময়িকভাবে একটি সড়কের নাম রাখা হয় ‘অ্যাভেনিদা বিটিএস’। এছাড়া শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গ্রুপটির প্রতীকী রং বেগুনি আলোয় আলোকিত করা হয়।

বিটিএসের এই কনসার্টগুলোর প্রভাব স্থানীয় পর্যটন ও পরিবহন খাতের অর্থনীতিতেও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। একটি স্থানীয় জরিপ অনুযায়ী, বুয়েনস এইরেসের নিকটবর্তী শহর লা প্লাতায় কনসার্ট দেখতে আসা দর্শকদের ৯৬ শতাংশই ছিলেন ওই শহরের বাইরের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষের জন্য এটিই ছিল প্রথম লা প্লাতা সফর। প্রায় ৪৮ হাজারের বেশি দর্শনার্থী সেখানে অন্তত এক রাত অবস্থান করেন এবং তাঁদের গড় অবস্থান ছিল সাড়ে তিন রাত। টিকিটের খরচ বাদ দিয়ে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও বিনোদনে তাঁদের ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ৫ হাজার ৩০০ কোটি আর্জেন্টাইন পেসো, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের সমান।

কনসার্ট ঘিরে ফ্লাইট ও আবাসনের চাহিদাও আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। বোগোতায় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ফ্লাইট বুকিং বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ। লিমায় প্রথম কনসার্টের দিন রাইড শেয়ারিং সেবার চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১৫ গুণ বেড়েছিল এবং কনসার্ট শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ গুণে। অন্যদিকে সান্তিয়াগোতে আবাসন খোঁজার হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

দক্ষিণ আমেরিকা সফর শেষ করে বিটিএস এবার এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী ১৯ নভেম্বর তাইওয়ানের কাওশিয়ুংয়ে শুরু হবে এই পর্ব। এরপর ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় কনসার্ট করবে গ্রুপটি। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনিতে পারফর্ম করার কথা রয়েছে তাদের।