পেরুর রাজধানী লিমায় তিনটি পৃথক কনসার্টের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে বিশ্বখ্যাত কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস। এই দেশটিতেই দলটির প্রথম সফর। লিমার এস্তাদিও সান মার্কোস স্টেডিয়ামে ৭, ৯ ও ১০ অক্টোবর ‘অ্যারিরাং’ ট্যুরের অংশ হিসেবে গান গেয়েছেন তারা। এই তিনটি কনসার্টে মোট ১ লাখ ৫১ হাজার ৫০০ দর্শক উপস্থিত ছিলেন।
প্রাথমিকভাবে লিমায় মাত্র দুটি কনসার্টের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে ভক্তদের প্রবল চাহিদার কথা বিবেচনা করে বিটিএসের এজেন্সি বিগ হিট মিউজিক তৃতীয় একটি কনসার্টের আয়োজন করে। শেষ পর্যন্ত তিনটি কনসার্টেরই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়।
পুরো কনসার্ট জুড়ে প্রিয় দলের গানের সাথে গলা মিলিয়েছেন ভক্তরা। উচ্ছ্বাস এবং করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। গানের পাশাপাশি সদস্যরা বেশ কয়েকবার স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে দর্শকদের চমকে দেন।
ভক্তদের প্রতি ভালোবাসা জানাতে তাঁরা স্প্যানিশ ভাষায় বলেন, “লস আমোস”। এই কথাটির অর্থ হলো, ‘আমি তোমাদের ভালোবাসি’। দর্শকদের এমন অভাবনীয় উচ্ছ্বাস দেখে তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন যে, তাঁরা আরও আগে কেন পেরুতে আসেননি।
জিমিনের জন্মদিনে ভক্তদের বিশেষ আয়োজন
বিটিএস সদস্য জিমিনের জন্মদিন ১৩ অক্টোবর। লিমায় কনসার্ট চলাকালীন তাঁকে ঘিরে ভক্তরা বিশেষ কিছু আয়োজন করেন। যদিও কনসার্টের ভেতরে আনুষ্ঠানিকভাবে জন্মদিন উদযাপনের কোনো কর্মসূচি ছিল না, তবে পুরো শহরজুড়ে ছিল নানা চমক।
জিমিনকে শুভেচ্ছা জানাতে ডিজিটাল বিলবোর্ড, রাস্তার পাশে ব্যানার এবং এলইডি পর্দা লাগানো ট্রাকের ব্যবস্থা করেন ভক্তরা। এছাড়া আয়োজন করা হয় এক জমকালো ড্রোন শো। রাতের আকাশে ড্রোনের আলোর মাধ্যমে ফুটে ওঠে জিমিনের নাম, তাঁর জন্মদিনের ছবি এবং একটি আবেগঘন বার্তা— “আমরা সব সময় তোমার পাশে থাকব।”
শনিবার লিমায় বিটিএসের শেষ কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়। বিদায়ী বক্তব্যের সময় ভক্তরা জিমিনের জন্য জন্মদিনের গান গেয়ে ওঠেন এবং তাঁর নাম ধরে স্লোগান দেন। এই ভালোবাসায় অভিভূত হয়ে জিমিন বলেন, “তোমরা যেভাবে আমাদের স্বাগত জানিয়েছ এবং যে ভালোবাসা ও সমর্থন দেখিয়েছ, তাতে আমি গভীরভাবে আপ্লুত। পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে তোমরা যে এত ভালোবাসা পাঠিয়ে আসছ, তা আমি সব সময় মনে রাখব।”
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনা
বিটিএসের এই কনসার্ট সিরিজ লিমার পর্যটন ও ব্যবসায়িক খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। পেরুর বৈদেশিক বাণিজ্য ও পর্যটন মন্ত্রণালয় আগে জানিয়েছিল যে, এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে রাজধানীতে ৫০ হাজারের বেশি দর্শনার্থী আসতে পারেন। এর ফলে পর্যটন খাতে প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
তবে লিমা চেম্বার অব কমার্সের হিসাব আরও আশাবহুল। তাদের মতে, হোটেল, খাবার, পরিবহন, পর্যটন এবং স্মারক পণ্য বিক্রির মাধ্যমে ১৫ কোটি থেকে ২০ কোটি পেরুভিয়ান সলের অর্থনৈতিক লেনদেন হতে পারে। মার্কিন ডলারে এর পরিমাণ আনুমানিক ৪ কোটি ৩৫ লাখ থেকে ৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
হোটেলের সামনে ভিড় নিয়ে আরএম-এর ব্যাখ্যা
লিমায় পৌঁছানোর আগে হোটেলের বাইরে ভিড় না করার জন্য ভক্তদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন বিটিএসের নেতা আরএম। বৃহস্পতিবার উইভার্সে দেওয়া তাঁর একটি পোস্টে লাতিন আমেরিকার প্রসঙ্গ আসায় কিছু ভক্ত আপত্তি জানান। তাঁদের দাবি ছিল, শিল্পীদের ব্যক্তিগত পরিসরে এমন হস্তক্ষেপ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ঘটে থাকে।
শুক্রবার ভক্তদের সাথে কথা বলার সময় আরএম বিষয়টি পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, তাঁর বক্তব্য নির্দিষ্ট করে শুধু পেরু বা লাতিন আমেরিকার জন্য ছিল না। আরএম বলেন, “গতকাল আমি যে পোস্ট লিখেছি, সেটি শুধু লাতিন আমেরিকা বা পেরুকে নিয়ে ছিল না। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে। আসলে দীর্ঘদিন ধরেই এমনটা হচ্ছে। এশিয়াতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।”
অনেক ভক্ত সদস্যদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তা স্বীকার করলেও কিছু আচরণ সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে জানান আরএম। উদাহরণ হিসেবে তিনি সদস্যদের হোটেলকক্ষের ওপর ড্রোন ওড়ানো এবং তাঁদের দিকে লেজার আলো তাক করার কথা উল্লেখ করেন।
ভক্তদের জাতীয়তা বা মহাদেশের ভিত্তিতে আলাদা করার তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি। আরএম বলেন, “আমরা কখনো মানুষকে জাতীয়তা বা মহাদেশের ভিত্তিতে আলাদা করেছি? আর্মি (বিটিএসের ভক্তদের নাম) এবং বিটিএসের পরিচয়ে আমরা সবাই একই মানুষ।”
তিনি আরও বিশ্বাস করেন যে, অনধিকার চর্চাকারী ভক্তদের চেয়ে সম্মানজনক আচরণ করা ভক্তদের সংখ্যাই অনেক বেশি এবং পেরুর ক্ষেত্রেও তাঁর এই বিশ্বাস অটুট।
লিমার সফর শেষ করে বিটিএসের পরবর্তী গন্তব্য চিলির সান্তিয়াগো। সেখানে ১৫ থেকে ১৭ অক্টোবর কনসার্ট করবে দলটি। এরপর তাঁরা যাবেন আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস ও ব্রাজিলের সাও পাওলোতে।