মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। কোথাও বাতাসে দুলছে কচি ধানের চারা, আবার কোথাও শিষে দানা বাঁধার অপেক্ষায় ধানগাছ। এই বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের মাঝে বাঁশের খুঁটিতে ঝুলছে ছোট ছোট প্লাস্টিকের বৈয়াম। দূর থেকে সাধারণ পাত্র মনে হলেও, এগুলো মূলত ধানের ক্ষতিকর মাজরা পোকা নিয়ন্ত্রণের এক পরিবেশবান্ধব কৌশল। রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কৃষকেরা এখন সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করছেন। স্বল্প খরচের এই পদ্ধতিটি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।

উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, আমন ধানের ক্ষেতে সারি সারি বাঁশের খুঁটিতে প্লাস্টিকের বৈয়াম ঝুলছে। এসব বৈয়ামের ভেতরে রাখা হয়েছে বিশেষ ধরনের ফেরোমন লিউর। এই লিউরটি স্ত্রী পোকার শরীর থেকে নিঃসৃত গন্ধের অনুরূপ রাসায়নিক সংকেত তৈরি করে। সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ মাজরা পোকা বৈয়ামের ভেতরে প্রবেশ করে এবং সেখানে সাবানমিশ্রিত পানিতে পড়ে মারা যায়। এর ফলে পুরুষ ও স্ত্রী পোকার মিলন এবং বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও সঠিক পরামর্শের ফলে স্থানীয় কৃষকেরা এই পদ্ধতি ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষকদের মতে, আগে ধানক্ষেতে পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিলেই বাজার থেকে রাসায়নিক কীটনাশক কিনে স্প্রে করতে হতো। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ত, তেমনি স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা থাকত। এখন ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের ফলে কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়েছে।

বড়হিত ইউনিয়নের কৃষক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আগে মাজরা পোকার আক্রমণ হলেই জমিতে কীটনাশক স্প্রে করতে হতো। এতে খরচ বাড়ত, ছিল স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি। এখন ফেরোমন ফাঁদে পোকা আটকা পড়ছে, কমছে বংশবিস্তার। অল্প খরচে ফসল সুরক্ষার পাশাপাশি কীটনাশক কেনার টাকাও বাঁচছে। এতে আমরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি।’

শুরুতে এই পদ্ধতি নিয়ে আশপাশের অনেক কৃষকের মনে সংশয় ছিল। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করেও যখন অনেক সময় পোকা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন একটি ছোট প্লাস্টিকের বৈয়াম কীভাবে পোকা দমন করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল তাদের। তবে মাঠে এর বাস্তব প্রয়োগ ও ফলাফল দেখে সেই ধারণা এখন বদলাতে শুরু করেছে।

পার্শ্ববর্তী এলাকার কৃষক মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘ফেরোমন ফাঁদে বড়হিত ইউনিয়নের অনেক কৃষক ভালো ফল পাচ্ছেন। প্রথমে বিশ্বাস না হওয়ায় আমি নিজের জমিতে প্রচলিত কীটনাশক ব্যবহার করি। এখন নিজের জমিতেও ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

স্থানীয় কৃষকদের মতে, ফেরোমন ফাঁদের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এটি স্থাপনের পর নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করার প্রয়োজন অনেক কমে যায়। ফলে জমিতে কাজের চাপ ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায় এবং কৃষকেরা তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশে চাষাবাদ করতে পারেন।

আরেক কৃষক আবদুল কাদের বলেন, ‘ধান চাষে সার, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে এমনিতেই অনেক টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে বাড়তি টাকা দিয়ে কীটনাশক কিনতে হয়। অনেক সময় একাধিকবার স্প্রে করতে হয়। ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করলে এই খরচ অনেকটাই কমানো যায়। কৃষি কর্মকর্তারা যদি মাঠপর্যায়ে আরও বেশি কৃষককে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন, তাহলে এ পদ্ধতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, একসময় যে বৈয়াম দেখে কৃষকেরা বিস্মিত হতেন, এখন সেটিই তাদের কাছে ধানক্ষেতের নিরাপত্তার নতুন হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বল্প খরচে পরিবেশবান্ধব কৃষির পথে এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সেক্স ফেরোমন ফাঁদ অত্যন্ত পরিবেশবান্ধব এবং স্বল্প খরচে স্থাপন করা যায়। প্রতি কাঠায় চারটি ফাঁদ স্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রতিটি ফেরোমন লিউর তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ৪০ টাকা। ধান রোপণের ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে জমিতে এই ফাঁদ স্থাপন করতে হয়। সঠিকভাবে স্থাপন ও নিয়মিত পরিচর্যা করা হলে একটি লিউর ধান কাটা পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে। এই পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পোকার বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে কীটনাশকের ব্যবহার কমে এবং উৎপাদন খরচ সাশ্রয় হয়।

তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার কমাতে ফেরোমন ফাঁদের মতো সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি সব ধরনের পোকা দমনের বিকল্প নয়; এটি নির্দিষ্ট প্রজাতির পোকার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর। তাই জমিতে পোকার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত ফাঁদের পরিচর্যা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।

আগামী বোরো মৌসুমে এই ফাঁদের ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রিপা রানী চৌহান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সেক্স ফেরোমন ফাঁদে ব্যবহৃত ওয়াইএসবি লিউরের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ মাজরা পোকা বৈয়ামের ভেতরে ঢুকে সাবানপানিতে পড়ে মারা যায়। এতে পোকার বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার ও উৎপাদন খরচ কমে, সুরক্ষিত থাকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘পার্টনার প্রোগ্রাম ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের এ পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে পরামর্শ ও সহযোগিতাও দেওয়া হচ্ছে। আগামী বোরো মৌসুমে ফেরোমন ফাঁদ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহের উপপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর কৃষকদের নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, মাটির উপকারী জীবাণু ও জলজ জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেক্স ফেরোমন ফাঁদ এ ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর উপাদান। এটি নির্দিষ্ট প্রজাতির ক্ষতিকর পোকা দমনে কাজ করে। আমরা চাই, কৃষকেরা প্রয়োজন ছাড়া রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির দিকে এগিয়ে আসুন। এ জন্য মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে।’